ঈদ মানেই আনন্দের উৎসব। নতুন পোশাক, কেনাকাটা আর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন মানুষ কিন্তু এই উৎসবকেন্দ্রিক উচ্ছ্বাসকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে একশ্রেণির প্রতারক চক্র। প্রতি বছর ঈদ ঘিরে অনলাইন কেনাকাটায় প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে, যা ক্রেতাদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কেনাকাটার প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঈদ সামনে রেখে ফেসবুকভিত্তিক দোকান, ভুয়া ই–কমার্স সাইট এবং বিভিন্ন অনলাইন পেজের মাধ্যমে অনেক মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
জানা গেছে, ঈদের প্রায় এক থেকে দেড় মাস আগে এই ধরনের প্রতারণা সবচেয়ে বেশি ঘটে। কারণ এই সময় বিপুলসংখ্যক ক্রেতা অনলাইনে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, ইলেকট্রনিক পণ্যসহ নানা সামগ্রী কেনার জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ক্রেতাদের এই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকরা নানা ফাঁদ তৈরি করে। অনলাইন কেনাকাটায় সচেতনতার অভাব এবং আকর্ষণীয় অফারের প্রলোভন—এই দুই কারণেই সাধারণ ক্রেতারা সহজে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। দ্রুত লাভের আশায় প্রতারক চক্র নানা কৌশল ব্যবহার করে ক্রেতাদের ফাঁদে ফেলছে।
বর্তমানে দেশের অনলাইন বাণিজ্যের বড় একটি অংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর। বিশেষ করে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অসংখ্য ছোট-বড় দোকান পরিচালিত হচ্ছে। তবে এসব পেজের অনেকগুলোরই কোনো ধরনের নিবন্ধন নেই। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া হিসেবেও প্রমাণিত হচ্ছে। ঈদ উপলক্ষে এসব পেজে নানা আকর্ষণীয় অফার দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হয়। অনেক সময় ব্র্যান্ডেড পোশাক বা দামি পণ্য অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। ক্রেতারা সেই বিজ্ঞাপন দেখে অগ্রিম টাকা পাঠালে পরে আর কোনো পণ্য হাতে পান না।
প্রতারণার শিকার ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা সাদিয়া রহমান জানান, ঈদের জন্য একটি শাড়ি কিনতে তিনি ফেসবুকের একটি পেজে অর্ডার করেছিলেন। পেজটি বিকাশে অগ্রিম টাকা পাঠাতে বলে। তিনি টাকা পাঠানোর পর কয়েকদিন যোগাযোগ করা গেলেও পরে পেজটির পক্ষ থেকে আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তার ভাষায়, তিনি ভেবেছিলেন ভালো অফার পেয়েছেন, কিন্তু পরে বুঝেছেন পুরো বিষয়টি ছিল প্রতারণা।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান দক্ষিণ বনশ্রীর বাসিন্দা জেসমিন আক্তার। তিনি ঈদের কেনাকাটার জন্য ফেসবুকের একটি পেজ থেকে সাত হাজার টাকার একটি জামা অর্ডার করেন। পেজটি ঢাকার বাইরে হওয়ায় আগে ১৫০ টাকা ডেলিভারি চার্জ পাঠাতে বলা হয়। পরে এসএম পরিবহন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো হয়। কিন্তু প্যাকেট খুলে তিনি দেখেন, সাত হাজার টাকার জামার পরিবর্তে সেখানে মাত্র চারশো টাকার একটি বাটিকের জামা রয়েছে। বিষয়টি জানাতে গেলে পেজটির পক্ষ থেকে তাকে ব্লক করে দেওয়া হয়।
শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নয়, অনেক প্রতারক চক্র ভুয়া ই–কমার্স ওয়েবসাইট তৈরি করেও প্রতারণা চালাচ্ছে। এসব ওয়েবসাইট দেখতে অনেক সময় বড় প্রতিষ্ঠানের মতোই পেশাদার মনে হয়। সেখানে বিভিন্ন পণ্যের আকর্ষণীয় ছবি, বড় ধরনের ছাড় এবং দ্রুত ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু ক্রেতা টাকা পরিশোধ করার পর পণ্য আর পৌঁছায় না। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানান, অনেক সময় এসব ওয়েবসাইটের ডোমেইন নাম বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়, যাতে ক্রেতারা সহজেই বিভ্রান্ত হন। ফলে অনেকেই না বুঝেই প্রতারণার শিকার হয়ে পড়েন।
অনলাইন প্রতারণার আরেকটি সাধারণ কৌশল হলো ভিন্ন বা নিম্নমানের পণ্য পাঠানো। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা যে পণ্য অর্ডার করেন, তার পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন বা নিম্নমানের পণ্য হাতে পান। ঈদের পোশাকের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। অনলাইনে যে পোশাকের ছবি দেখে অর্ডার করা হয়, ডেলিভারির সময় দেখা যায় পণ্যের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। অনেক ক্ষেত্রেই ফেরত দেওয়ার সুযোগও থাকে না।
অনলাইন কেনাকাটায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ। অনেক প্রতারক প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র অগ্রিম টাকা নেওয়ার উদ্দেশ্যেই ভুয়া দোকান চালু করে। টাকা পাওয়ার পর তারা ক্রেতার ফোন ধরা বন্ধ করে দেয় বা পেজটি বন্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে আবার নতুন নামে নতুন পেজ খুলে একই ধরনের প্রতারণা চালিয়ে যায়।
ঈদকে সামনে রেখে কেনাকাটার চাপ বাড়ার বিষয়টিকে প্রতারণার বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, উৎসবের সময় মানুষ দ্রুত কেনাকাটা করতে চান। সময়ের স্বল্পতা ও ব্যস্ততার কারণে অনেকেই পণ্য বা বিক্রেতা যাচাই না করেই অনলাইনে অর্ডার দেন। এই প্রবণতাকেই কাজে লাগায় প্রতারক চক্র। এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মেগা সেল’, ‘লাস্ট মিনিট অফার’ কিংবা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের মতো নানা প্রচারণা চালিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হয়। আকর্ষণীয় এসব অফারের প্রলোভনে পড়ে অনেকেই যাচাই-বাছাই ছাড়াই কেনাকাটা করেন, যা প্রতারণার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
অনলাইন প্রতারণা ঠেকাতে শুধু প্রযুক্তিগত নজরদারি নয়, জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। ক্রেতারা সচেতন হয়ে যাচাই করে কেনাকাটা করলে প্রতারকদের সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে। পাশাপাশি প্রতারণা রোধে কঠোর নজরদারি, নিবন্ধন ব্যবস্থা জোরদার এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
অনলাইন প্রতারণা দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট ও র্যাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে। সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতারকরা প্রায়ই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই পেজ বা ওয়েবসাইট পরিবর্তন করে ফেলে। ফলে অনেক সময় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তের মাধ্যমে প্রতারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অচেনা ফেসবুক পেজ বা ওয়েবসাইট থেকে কেনাকাটা না করাই ভালো। সম্ভব হলে ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি বিক্রেতার রিভিউ, আগের ক্রেতাদের মন্তব্য এবং যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা জরুরি। সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক কম দামের অফার দেখলে তা এড়িয়ে চলার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে ই-কমার্স খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। অনলাইন বাণিজ্যের মাধ্যমে হাজার হাজার উদ্যোক্তা নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছেন। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে পুরো খাতের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম বলেন, ঈদকে সামনে রেখে অনলাইন কেনাকাটায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো পণ্য কেনার আগে বিক্রেতার পরিচয়, রিভিউ এবং যোগাযোগের তথ্য যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে অস্বাভাবিক কম দামের অফার দেখলে সতর্ক থাকতে হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, ঈদের সময় অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা বাড়ে এবং এই সময়টিকে লক্ষ্য করেই একটি প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পেজ খুলে আকর্ষণীয় অফারের মাধ্যমে তারা ক্রেতাদের ফাঁদে ফেলে। তাই ভোক্তাদের সচেতন হওয়া এবং যেকোনো অনলাইন কেনাকাটার আগে বিক্রেতার সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতারণা বন্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি আরও বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে অনলাইন বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছে। তবে এই খাতে সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি না থাকলে প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। বিশেষ করে উৎসবের সময় কেনাকাটা বাড়ার সঙ্গে প্রতারক চক্রের সক্রিয়তাও বাড়ে। তাই ই–কমার্স খাতে আস্থা ধরে রাখতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং ভোক্তাদের সচেতনতা জরুরি।
ইনফিনিটি ব্র্যান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজমুল হক খান বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে অনলাইনে ভুয়া অফারের প্রবণতা বাড়ে। অনেক সময় তাদের ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে কম দামে পণ্য দেওয়ার কথা বলে প্রতারণা করা হয়। তাই ক্রেতাদের শুধু অফিশিয়াল পেজ বা অনুমোদিত আউটলেট থেকেই কেনাকাটা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আড়ং ব্র্যান্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাফিস সাদাত বলেন, ঈদের সময় অনলাইনে কেনাকাটার চাপ বেড়ে যায়। এই সুযোগে অনেক ভুয়া পেজ বা অননুমোদিত বিক্রেতা ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে প্রতারণা করছে। তাই ক্রেতাদের সবসময় অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা অনুমোদিত প্ল্যাটফর্ম থেকে পণ্য কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ইয়েলো ব্র্যান্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের পণ্যের ছবি ব্যবহার করে অনেক ভুয়া পেজ তৈরি করা হচ্ছে, যা ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করছে। তাই কোনো অফার দেখলে আগে পেজটির সত্যতা যাচাই করা এবং অফিশিয়াল পেজ ছাড়া অন্য কোথাও অগ্রিম টাকা না দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঈদ আনন্দের উৎসব হলেও এই সময় প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ে। তাই অনলাইনে কেনাকাটার সময় সতর্ক থাকা এবং যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নিরাপদ ই–কমার্স ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই ধরনের প্রতারণা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

