চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিচিত। নামের সঙ্গে ‘জঙ্গল’ থাকলেও অবাধ পাহাড় কাটার কারণে এলাকার প্রাকৃতিক রূপ দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পাহাড় কেটে তৈরি খাসজমির ওপর গড়ে ওঠা এই এলাকা স্থানীয়দের কাছে অনেক দিন ধরেই ‘সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল’ হিসেবে পরিচিত।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় তিন হাজার একশো একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই পাহাড়ি এলাকা। প্রশাসনিকভাবে এটি সীতাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও বাস্তবে এটি অনেকটা নগরের ভেতরেই পড়ে। পূর্ব দিকে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা এলাকা এর সীমানা ঘিরে রয়েছে।
এখানে বর্তমানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষের বসবাস। অধিকাংশই নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ এবং বিপুলসংখ্যক ছিন্নমূল বাসিন্দা, যারা কম খরচে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার কারণে এখানে বসতি গড়ে তুলেছেন। তবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্যের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা দীর্ঘদিন ধরেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
পাহাড়কাটা ও অপরাধের বিস্তার:
জঙ্গল সলিমপুর মূলত দুটি অংশে বিভক্ত—একদিকে ছিন্নমূল এলাকা এবং অন্যদিকে আলীনগর। উভয় অংশেই পাহাড় কেটে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, দোকানপাট এবং বিপণিবিতান। পাহাড় কেটে তৈরি করা হচ্ছে প্লট, আর সেই প্লটকে কেন্দ্র করেই এখানে গড়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী।
অপরাধমূলক কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে মাদক ব্যবসা, অস্ত্র সরবরাহ, অবৈধ প্লট বাণিজ্য এবং পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন। স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ এলাকা রয়েছে এবং এসব এলাকায় প্রবেশের জন্য অনেক সময় পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়। ফলে সাধারণ মানুষ প্রায়ই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্বের মাঝখানে পড়ে যায়।
এই এলাকার সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মশিউর–গফুর গ্রুপ, রোকন গ্রুপ এবং ইয়াসিন গ্রুপ উল্লেখযোগ্য। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মশিউর–গফুর গ্রুপের আধিপত্য থাকলেও পরবর্তী সময়ে রোকন গ্রুপের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। আলীনগর এলাকায় আগে ইয়াসিন গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে রোকন গ্রুপ সেই এলাকা দখল করে পুরো সলিমপুরে আধিপত্য বিস্তার করেছে।
নব্বইয়ের দশক থেকে সন্ত্রাসের ভিত্তি:
জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসী ইতিহাস শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই সময় সন্ত্রাসী আলী আক্কাস পাহাড় কেটে এখানে বসতি স্থাপন শুরু করেন। দখল ধরে রাখতে তিনি নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন।
এলাকাটি দুর্গম পাহাড়ি হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সেখানে অভিযান চালানো সহজ ছিল না। এই সুযোগে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পাহাড়ি খাসজমি বিক্রি শুরু করে আক্কাসের বাহিনী। প্লট বিক্রি এবং পাহাড় দখল নিয়ে একসময় তার বাহিনীর ভেতরেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
পরে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন আলী আক্কাস। তার মৃত্যুর পর সহযোগীরা আলাদা আলাদা গোষ্ঠী গড়ে তোলে। তাদের মধ্যে কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার এবং গাজী সাদেক নিজস্ব দল গঠন করেন।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক আশ্রয়–প্রশ্রয়ও এই এলাকায় প্রভাব ফেলেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইয়াসিন মিয়া সীতাকুণ্ডের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বর্তমানে ইয়াসিন আলীনগর বহুমুখী সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন।
অন্যদিকে মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন কাজী মশিউর এবং গাজী সাদেক। যারা প্লট কিনেছেন, তারাই এই দুই সমিতির সদস্য। বর্তমানে এই দুই সংগঠনে প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছে বলে জানা গেছে।
বাইরের মানুষের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা:
জঙ্গল সলিমপুরের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো বাইরের মানুষের প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশেষ করে আলীনগর এলাকায় বাইরের লোকজনের প্রবেশ অনেকটাই নিষিদ্ধ।
বাসিন্দাদের কোনো আত্মীয়স্বজন এলে তাদের মূল ফটকে এসে অনুমতি নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। আগে অনেক জায়গায় সশস্ত্র পাহারাও দেখা যেত। এই নিয়ন্ত্রণের ফলে দীর্ঘদিন ধরে এলাকা কার্যত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবেই পরিচালিত হয়েছে।

র্যাব কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড:
এই হত্যাকাণ্ড প্রশাসনের কাছে পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। এর পর থেকেই জঙ্গল সলিমপুরে বৃহৎ ও সুসংগঠিত অভিযান পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
যৌথ বাহিনীর অভিযান:
গত সোমবার ভোর থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং এপিবিএন যৌথভাবে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান শুরু করে। দিনব্যাপী চলা এই অভিযানে ড্রোন ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এলাকার প্রবেশ ও প্রস্থানপথে চেকপোস্ট বসিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে। অভিযান শুরুর আগে অনেক বাধা সরাতে হয়। কোথাও রাস্তার ওপর ট্রাক রেখে পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, আবার কোথাও কালভার্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান জানান, এসব প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধাপে ধাপে এগিয়ে যায়। কোথাও ইট–বালু ফেলে রাস্তা মেরামত করে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

অভিযানে অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে এবং কিছু অস্ত্রসহ তল্লাশি সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বড় কোনো সন্ত্রাসী নেতাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হয়নি।
অভিযান শেষে সেখানে পুলিশ ও র্যাবের দুটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যা এলাকার নিরাপত্তা তদারকি ও সন্ত্রাস দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ জানান, অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, সন্ত্রাস প্রতিরোধ এবং এলাকাকে নিরাপদ করা।
সরেজমিনে যা দেখা গেছে:
বায়েজিদ–ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক দিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করতে হয়। এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীত পাশের একটি সড়ক ধরে এগোলেই শুরু হয় পাহাড়বেষ্টিত এই এলাকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে সড়ক। পাহাড়ের পাদদেশ ও ঢালে অসংখ্য ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় ইটের দেয়াল তুলে প্লট তৈরি করা হয়েছে।
এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের আশপাশে দোকানপাট এবং দ্বিতল মার্কেটও রয়েছে। বিদ্যালয়ের সামনে একটি মোড় থেকে তিনটি রাস্তা বিভিন্ন দিকে চলে গেছে। এর একটি যায় আলীনগরের দিকে।
এলাকার বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে পাহাড় প্রায় সম্পূর্ণ ন্যাড়া হয়ে গেছে। কোথাও আবার ধাপে ধাপে পাহাড় কেটে নতুন প্লট তৈরি করা হচ্ছে।
উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ:
২০২২ সালের ২৩ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসন জঙ্গল সলিমপুরকে ১১টি ভাগে ভাগ করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার–২, মডেল মসজিদ এবং নভোথিয়েটার নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল।
কারাগারের ধারণক্ষমতার তিন গুণের বেশি বন্দী থাকায় নতুন কারাগার তৈরির জন্য এখানে ৫০ একর জমি নির্ধারণ করা হয়। আদালত ভবন, মেডিকেল কলেজ এবং পুলিশ লাইনের কাছাকাছি হওয়ায় স্থানটি কারাগারের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছিল।
তবে জমি দখলমুক্ত করা না যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন জানিয়েছেন, প্রশাসনের কর্তৃত্ব এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সরকারের পূর্বের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা:
বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে এর ইতিবাচক প্রভাব স্থানীয় মানুষের জীবনে পড়বে। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে শিশু ও শিক্ষার্থীরা নিরাপদে স্কুলে যেতে পারবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও স্থিতিশীল হবে।
পাহাড়কাটা, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে এলে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হবে এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী মনে করেন, সরকারি জমি যাতে আর বেহাত না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনকে কঠোর থাকতে হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পিত উন্নয়ন দ্রুত শুরু করা প্রয়োজন।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ:
যদিও সাম্প্রতিক অভিযান প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবু জঙ্গল সলিমপুরের মতো দুর্গম এলাকায় দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয় জনগণকে এই প্রক্রিয়ার অংশ করে তোলা। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই জঙ্গল সলিমপুরকে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল এলাকায় রূপান্তর করা সম্ভব।
জঙ্গল সলিমপুরে সাম্প্রতিক যৌথ অভিযান দেখিয়েছে, পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকাতেও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তবে সেই সাফল্য টেকসই করতে হলে প্রশাসনিক দৃঢ়তা, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং সামাজিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ একসঙ্গে চালিয়ে যেতে হবে।

