কারাবন্দী সাবেক এক আওয়ামী লীগ নেতাকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে। হোয়াটসঅ্যাপের একাধিক অডিও কথোপকথনে এমন দাবি উঠে এসেছে।
রেকর্ডিংগুলোতে চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর মামলার দায়িত্বে থাকা প্রসিকিউটরদের একজন মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যদের কথোপকথন শোনা যায়। জামিনের বিষয়টি নিয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম শহরে শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা রয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ কলের একটি রেকর্ডিংয়ে পরিবারের এক সদস্যকে আগের আলোচনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সাইমুম রেজা তালুকদার বলেন, তিনি যদি শেষ পর্যন্ত ফজলে করিমকে মুক্ত করতে পারেন, তবে একটি “ভালো অঙ্কের” অর্থ দিতে হবে। সেখানে তিনি এক কোটি টাকার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি ওই অর্থের মধ্যে অন্তত ১০ লাখ টাকা অগ্রিম নগদ দেওয়ার কথাও বলেন।
এই অভিযোগ জানার পর তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম সাইমুম রেজা তালুকদারকে ওই মামলা থেকে সরিয়ে দেন। তবে ট্রাইব্যুনালের অন্য দায়িত্ব থেকে তাঁকে অপসারণ করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটরের পদে পরিবর্তন আসে। তখন সাইমুম রেজা তালুকদার ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারকে জানান, তিনি আবার মামলাটির সঙ্গে যুক্ত হবেন।
ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের একজন সদস্য বলেন, এরপর তাঁদের পক্ষ থেকে নতুন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে সাইমুম রেজা তালুকদারের কয়েকটি কথোপকথনের রেকর্ডিং দেওয়া হয়। পরে সাইমুম তাঁদের জানান, এ বিষয়ে মন্ত্রী তাঁকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেন।
পরিবারের দাবি, সাবেক এই সংসদ সদস্যকে আটকের প্রায় দুই মাস পর গত বছরের এপ্রিলে প্রথম তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সাইমুম রেজা তালুকদার। তখন তিনি বলেন, অর্থের বিনিময়ে ফজলে করিম চৌধুরীর জামিন নিশ্চিত করা সম্ভব। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি সংগ্রহ করতেও তিনি সহায়তা করতে পারবেন বলে জানান। তবে পরিবারের সদস্যরা বলেন, তাঁরা কখনোই ওই প্রসিকিউটরকে টাকা দেননি এবং দেওয়ার ইচ্ছাও ছিল না। বরং সম্ভাব্য দুর্নীতির প্রমাণ সংগ্রহের জন্য তাঁরা তাঁর সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে যান।
মো. সাইমুম রেজা তালুকদার পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকার নাগরিক সমাজে তিনি পরিচিত মুখ। ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ও নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হলেও আইসিটিতে নিয়োগ পাওয়ার আগে তাঁর মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা সীমিত ছিল। অভিযোগ প্রসঙ্গে সাইমুম রেজা তালুকদার তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “এটি সত্য নয়। এ ধরনের কোনো বিষয় সম্পর্কে আমি জানি না।” তাঁর বক্তব্য, কোনো একক প্রসিকিউটরের পক্ষে কারও জামিন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রধান প্রসিকিউটরের মাধ্যমে দলগতভাবে নেওয়া হয়। তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর পদত্যাগের সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই। কয়েক দিন ধরেই তিনি শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন বলে জানান।
ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের দাবি, পরবর্তী কথোপকথনে সাইমুম রেজা তালুকদার তাঁদের আইসিটির এক তদন্ত কর্মকর্তাকে টাকা দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, ওই কর্মকর্তা ফজলে করিমের বিচারের দাবিতে সক্রিয় মুনিরিয়া নামে একটি ধর্মীয় সংগঠন থেকে ঘুষ নিয়েছেন।
তবে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি এবং তাঁকে মামলাটি থেকে সরানো হয়নি—এমন দাবিও করেন সাইমুম রেজা। একইভাবে নতুন আইনমন্ত্রী তাঁকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেন—এই অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে কেবল শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার বিষয়েই কথা বলেছেন। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
ট্রাইব্যুনালে মামলা
ফজলে করিম চৌধুরী আওয়ামী লীগ থেকে পাঁচবার চট্টগ্রাম-৬ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ সময় ধরে নিজ এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতা–কর্মীদের ওপর দমন–পীড়নের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম শহরে তিনজন নিহত হন। ওই ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফজলে করিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দুই দিন পর, অর্থাৎ ১৮ জুলাই শহরে আরও দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। ওই ঘটনাতেও তাঁর বিরুদ্ধে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তাঁকে প্রথমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি। এ ছাড়া দণ্ডবিধির আওতায় করা পৃথক মামলায় তাঁকে ফৌজদারি আদালতেও গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মূলত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার জন্য গঠিত হয়। বর্তমানে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও এই ট্রাইব্যুনালে চলছে।
কথোপকথন ও অভিযোগ
ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের দাবি, তাঁকে আটকের প্রায় দুই মাস পর গত বছরের এপ্রিলে প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার প্রথম তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন তিনি বলেন, অর্থের বিনিময়ে ফজলে করিম চৌধুরীর জামিন নিশ্চিত করা সম্ভব। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি সংগ্রহ করতেও সহায়তা করতে পারবেন বলে জানান।
পরিবারটি জানায়, শুরুতে হওয়া এসব কথোপকথন রেকর্ড করা হয়নি। তবে পরে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় তারা আলাপগুলো রেকর্ড করতে শুরু করে। পরিবারের হিসাব অনুযায়ী, সাইমুম রেজা মোট ২৬ বার তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। মধ্যস্থতাকারী ব্যবহার করে এবং নিজেও অন্তত ১৪ বার অর্থ দাবি করেছেন বলে তাদের অভিযোগ।
পরিবারের দাবি, পরবর্তী কথোপকথনে সাইমুম রেজা তাঁদের আইসিটির এক তদন্ত কর্মকর্তাকে টাকা দেওয়ার পরামর্শও দেন। তাঁর দাবি ছিল, ওই কর্মকর্তা ফজলে করিম চৌধুরীর বিচারের দাবিতে সক্রিয় মুনিরিয়া নামে একটি ধর্মীয় সংগঠন থেকে ঘুষ নিয়েছেন। তবে মুনিরিয়া সংগঠন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাও অর্থ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ফজলে করিম চৌধুরীর জরুরি চিকিৎসার আবেদন ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়। আবেদন জমা দেওয়ার প্রায় ১০ মিনিট পর সাইমুম রেজা তালুকদার তাঁদের ফোন করেন। তিনি জানান, আবেদন সম্পর্কে তিনি ইতিমধ্যে অবগত। কেন তাঁরা আগে থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি—সে প্রশ্নও তোলেন এবং ইঙ্গিত দেন যে আবেদনটি মঞ্জুর করতে অর্থ লাগতে পারে।
সেই ফোনকলটি রেকর্ড করা হয়নি। তবে একই দিন সন্ধ্যায় আরেকটি কথোপকথন রেকর্ড করা হয়। সেখানে ফজলে করিমের পরিবারের সদস্যরা জানতে চান, তিনি কত টাকা চান। উত্তরে সাইমুম রেজা বলেন, “আলটিমেটলি যদি একটা ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সব মিলিয়ে ওনার ব্যাপারে একটা এক্সপেক্টেশন থাকবে—ওয়ান।” তিনি জানান, অর্থটি কিস্তিতেও দেওয়া যেতে পারে—১০ লাখ, ২০ লাখ বা অন্য যেকোনো পরিমাণে। পরবর্তী কথোপকথনে পরিবারটি বুঝতে পারে, তিনি মোট এক কোটি টাকা বোঝাতে চেয়েছেন এবং সেটি কয়েক কিস্তিতে নেওয়ার কথাও বলেছেন।
একই আলোচনায় সাইমুম রেজা মামলার বিষয়ে প্রসিকিউশনের অভ্যন্তরীণ বৈঠকের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি ইঙ্গিত দেন, তদন্তকারীরা পর্যাপ্ত প্রমাণ খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ছেন। তাঁর ভাষ্যে, “যেহেতু পুলিশ কিছুই পাচ্ছে না, এখন বড় বড় কয়েকজন দিয়ে ওরা এটা করতে চায়। অবশ্যই তারা তাকে ফাঁসাতে চায়—ফজলে করিম সাহেবকে ফাঁসাতে চায়।”
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সদস্যরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ দাবির অভিযোগ জানান এবং ট্রাইব্যুনালে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করা।
পরিবারের এক সদস্য বলেন, “আমরা প্রধান প্রসিকিউটরকে এই প্রসিকিউটরিয়াল দুর্নীতি এবং অসদাচরণের বিষয়ে সচেতন করতে চেয়েছিলাম। একই সঙ্গে অনুরোধ করেছিলাম, যেন তদন্ত এবং পরবর্তী কার্যক্রম কোনো পক্ষপাত ছাড়া আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়।” পরিবারের দাবি, ১০ ডিসেম্বরের কথোপকথনের রেকর্ডিংটি তারা তাজুল ইসলামকে শুনিয়েছিলেন, তবে কোনো কপি প্রদান করেননি। রেকর্ডিংটি শুনানোর পর সাইমুম রেজা তালুকদারকে মামলাটি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, যদিও তিনি ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য দায়িত্বে ছিলেন।
সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বিষয়টি খারিজ করে বলেন, “যে রেকর্ডিংটির কথা বলা হচ্ছে তা আমার কাছে যাচাই করার জন্য বা ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আসেনি। যদি তা দেওয়া হতো, তবে আমি পদক্ষেপ নিতাম। কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব ছিল না। আমি প্রসিকিউটরদের নিয়োগ বা অব্যাহতির কর্তৃপক্ষও ছিলাম না।”
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ ডিসেম্বর সাইমুম রেজা তালুকদার আবারও তাদের ফোন করেন। তিনি জানান, “চিফ প্রসিকিউটর বলছিলেন, আমার কাছে অডিও রেকর্ড আছে। আমি তো একটু অবাক হচ্ছি, হয়তো ব্লাফও (ধোঁকা) দিয়েছে।” একই সঙ্গে তিনি পরিবারকে সতর্ক করেন, যেন তারা তাদের ফোন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে সাবধান থাকেন।
ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সাইমুম রেজা, যিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, সম্ভবত ভেবেছিলেন এসব কথোপকথন সরকারি নজরদারি সংস্থার মাধ্যমে রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি বুঝতে পারেননি যে আসলে রেকর্ডিংটি পরিবারের সদস্যরাই করেছেন। এই ধারণার কারণে তিনি অর্থের বিষয়টি নিয়ে আলাপ চালিয়ে গেছেন এবং ফোন নিরাপত্তা বিষয়ে জোর দিয়েছেন।
নতুন সরকার, ট্রাইব্যুনালে পরিবর্তন:
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে বিএনপি। এর মাত্র ৯ দিন পরে তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত আইনজীবী আমিনুল ইসলাম।
নতুন চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগের পরপরই, ২৪ ফেব্রুয়ারি ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে ফোনালাপে আবারও যোগাযোগ করেন প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার। তিনি জানান, “আমি আবার এই মামলাতে যুক্ত হব।” সেই সঙ্গে বলেন, প্রসিকিউটররা শিগগিরই ফাইল পর্যালোচনা করবেন এবং তিনি ফজলে করিমের জামিনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরবেন। প্রধান প্রসিকিউটরকে তাঁর মতো করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন এবং চেষ্টা থাকবে যেন মামলা কঠিন না হয়ে যায়। অন্তত ফজলে করিমকে জামিন দিতে সক্ষম হওয়া যাবে।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে সাইমুম রেজা পুনরায় অর্থের বিষয়টি তোলেন। তিনি বলেন, “আমি একটু ফ্র্যাঙ্কলি বলি, আমি জানি না… আমি কি আপনাদের থেকে কোনো পার্ট পেমেন্ট চাইব নাকি সব একবারে পরে চাইব, কোনটা ভালো হবে? আগে রেজাল্ট হোক তারপর টাকা দেওয়া কি ভালো হবে?”
এরপর তিনি আবার আগের টাকার অঙ্কের বিষয়টিও উল্লেখ করেন। বলেন, “আপনাদেরকে লাস্ট টাইম বলেছিলাম, যদি আলটিমেটলি ওনাকে মুক্তি দেওয়া যায়, তখন আমি একটি ‘বেশ ভালো অ্যামাউন্ট’ আশা করেছিলাম—ওয়ান ক্রোর।” একই কথোপকথনে অগ্রিম টাকার কথাও উঠে আসে। সাইমুম রেজা বলেন, “হ্যাঁ, যদি সম্মত হন, কিছু পার্ট পেমেন্ট এখনই দেওয়া যেতে পারে। সবচেয়ে ভালো হবে যদি ১০ লাখের মতো অগ্রিম নগদ দেওয়া যায়।”
ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারকে তিনি আরও জানান যে, নতুন ট্রাইব্যুনাল নেতৃত্বে তাঁর প্রভাব বাড়বে। তিনি বলেন, “ইনশা আল্লাহ, কয়েক দিনের মধ্যে আমার প্রভাব আরও বাড়বে ট্রাইব্যুনালে। বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর বিএনপিপন্থী। দেখি কি করা যায়।”
এর দুই দিন পর, ২৬ ফেব্রুয়ারি, সাইমুম রেজা আবার ফোন করেন এবং ফজলে করিমের পক্ষে তদবির করার প্রতিশ্রুতি দেন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি আবারও টাকা বিষয়টি তোলেন। বলেন, “আমি জানি না, পার্ট পেমেন্ট আগে নেব নাকি পরে, কোনটা বেটার? কাজ হয়ে গেলে পরে দেওয়াই ভালো হবে কি?”
পরিবারের সদস্যরা তখন জানতে চায়, টাকা দেওয়ার উপায় কী হবে। সাইমুম রেজা জানান, “রেগুলার কোর্টে যখন আসবে, তখন একটি ফাঁকে আলাপ হবে। হাইকোর্টে গিয়ে এটি সাসপিশন তৈরি করবে। বুঝছেন তো?”
ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সদস্যরা ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলে তাদের কয়েকটি কথোপকথনের রেকর্ডিং নতুন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে পাঠান। এর মাত্র চার দিন আগে পরিবারটি আইনমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ দাবির অভিযোগ জানান।
পরবর্তী সময়ে ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে এক রেকর্ডকৃত কথোপকথনে সাইমুম রেজা তালুকদার অভিযোগ করেন, আইনমন্ত্রী তাঁকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আপনার সেই অডিও রেকর্ড করে আইনমন্ত্রীকে দিয়ে দিয়েছে। আপনি কি আমাকে একটু হেল্প করতে পারবেন? আইনমন্ত্রী আমাকে ফোন করে বলছে আমাকে পুলিশে দিতে।”
বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এই ঘটনার বিষয়ে অবগত নন। তিনি বলেন, “সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। কোনো তথ্য পাইনি। মন্ত্রীও এ বিষয়ে আমাকে কিছু বলেননি।”
প্রধান প্রসিকিউটর আরও জানান, তাঁর জানা অনুযায়ী সাইমুম রেজা তালুকদার পদত্যাগ করেছেন। তাঁর পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য, সোমবারই সাইমুম রেজা তালুকদার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সূত্র: প্রথম আলো

