বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় অন্তত ছয় দেশের ৭০ জনের জড়িত থাকার তথ্য নিশ্চিত করেছে পুলিশ সদর দফতরের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এদের মধ্যে দেশের স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ কমপক্ষে ১০ জন বাংলাদেশি কর্মকর্তা রয়েছেন। বাকি সন্দেহভাজনরা বিদেশি নাগরিক।
তদন্তকারীদের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা আন্তর্জাতিক এই চক্রে থাকা বিদেশিদের শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তারা বাংলাদেশেও গোপন অনুসন্ধান চালিয়েছে। সম্প্রতি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ৪০০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।
সিআইডি জানায়, এই প্রতিবেদন তাদের তদন্তকে আন্তর্জাতিক সীমার বাধা অতিক্রমে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনা হলেও মূল অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভে সংরক্ষিত ছিল, যা বিচারযোগ্য প্রমাণ হিসেবে কাজে লেগেছে। এর আগে জাপান ও ফিলিপাইনও এমএলএআরের মাধ্যমে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশকে হস্তান্তর করেছে।
তদন্ত সূত্র জানায়, সিআইডি যে বিদেশিদের শনাক্ত করেছে তাদের মধ্যে ৪০ জন ফিলিপাইনের নাগরিক। বাকি সন্দেহভাজনরা উত্তর কোরিয়া, চীন, জাপান, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের নাগরিক। তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন এবং ফৌজদারি আইনের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হবে। ড. আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অন্তত দুটি অভিযোগ আনা হতে পারে বলে জানিয়েছে সিআইডি।
তদন্ত সংস্থার তরফে অভিযোগপত্র দাখিলের সুনির্দিষ্ট সময় এখনও জানানো হয়নি। জানা গেছে, এ মামলায় অভিযোগপত্র ইতিমধ্যেই ৯৩ বার পেছানো হয়েছে। সর্বশেষ, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি সুপারিশ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রে চলমান মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত ঢাকায় অভিযোগপত্র না দেওয়ার। কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরিতে সিআইডি এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এই কর্মকর্তাদের তিনটি মূল ক্ষেত্রে দায়িত্বর সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ ১০ জনকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
১. আরটিজিএস ও ঝুঁকি অবহেলা: রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সিস্টেমকে সরাসরি সুইফ্ট নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করা হয়েছিল। এ ব্যবস্থায় ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়নি। যারা এ দায়িত্বে ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে সিআইডি অভিযোগ আনবে।
২. সংবেদনশীল সার্ভারের অনুমোদন: বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের জন্য ব্যবহৃত সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (এসডব্লিউআইএফটি) সার্ভার অত্যন্ত সংবেদনশীল। তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান এই সার্ভারের সঙ্গে রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সিস্টেম সংযুক্ত করার অনুমোদন দিয়েছিলেন। সিআইডি এটি অপরাধমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রিজার্ভ হ্যাকের পরও তৎকালীন গভর্নর কিছু দিন তথ্য গোপন রাখেন।
৩. ইমেইল হ্যাক ও দায়িত্ব: হ্যাকাররা মেলওয়্যার পাঠানোর পর, তা যাচাই না করে ডাউনলোড করা কর্মকর্তারাও অভিযুক্ত তালিকায় রয়েছেন। কেউ কেউ বিষয়টি প্রকাশ পেলে প্রযুক্তিগত কিছু ক্লু সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করেছেন।
তদন্তে দেখা গেছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ বিভাগগুলো হলো: ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট, অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং, আইটি অপারেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন, পেমেন্ট সিস্টেম এবং ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিংস রুম।
মার্কিন প্রতিবেদনে চারটি ক্যাসিনোর নাম প্রকাশ করা হয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে অর্থটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে সরানো হয়েছিল। এই ক্যাসিনোগুলো হলো: ফিলরেম, ইস্টার্ন হওয়াই, মিডাস ও সোলাইয়ার। অর্থ ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি) থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এসব ক্যাসিনোর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই চুরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত হ্যাকার গ্রুপ লেজারাস । গ্রুপটির নেতৃত্বে ছিলেন উত্তর কোরিয়ার নাগরিক পার্ক জিন ইউক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিকভাবে তদন্তে অনেক সময় এক দেশের গোয়েন্দা সংস্থা আরেক দেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করে। তবে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) প্রক্রিয়া ছাড়া এসব তথ্য আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় না। কয়েক বছরের অপেক্ষার পর বাংলাদেশ এই মার্কিন প্রতিবেদনটি পায়। এখন এটি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে আদালতে উপস্থাপনযোগ্য তদন্ত-দলিল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
সিআইডি প্রতিবেদন খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে প্রতিবেদনের কিছু ‘টেকনিক্যাল টার্ম’-এর ব্যাখ্যার জন্য বাইরের বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন বলেন, “মামলাটির তদন্ত এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। অভিযোগপত্র দাখিলের মতো অবস্থায় আমরা রয়েছি। কারা কীভাবে জড়িত, তা বের করা হয়েছে। দেশের বাইরে চাওয়া তথ্যও আমরা পেয়েছি।”
চুরি সংঘটিত হওয়ার পর ৩৯ দিন পর, বাংলাদেশ ব্যাংক রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করে। এরপর মামলাটির তদন্ত দায়িত্ব পায় সিআইডি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্তভার নিতে চায়, তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেয়নি।
মার্কিন আদালতে ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের আরসিবিসি ও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ফিলিপাইন থেকে ১৪.৬৬ মিলিয়ন ডলার এবং শ্রীলঙ্কা থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার ফেরত এসেছে। বাকি অর্থ এখনও দেশে ফেরেনি।
২০২৫ সালের মার্চে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল কমিটির নেতৃত্ব দেন। কমিটিতে ছিলেন একাধিক উপদেষ্টা, তৎকালীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, অ্যাটর্নি জেনারেল, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন পরিচালক এবং রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। কমিটিকে প্রশাসনিক সহায়তা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২৯ জানুয়ারি।
কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তদন্ত অগ্রগতি ও সরকারি পদক্ষেপ পর্যালোচনা, দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এবং পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন। পর্যালোচনা শেষে কমিটি মন্তব্য করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলমান মামলার রায়ের পর সিআইডির অভিযোগপত্র দাখিল করা সম্ভব।
পর্যালোচনা কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালনকারী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, সমকালকে বলেন, আমাদের প্রতিবেদন মন্ত্রিসভায় জমা দেওয়া হয়েছে।” প্রতিবেদনের বিস্তারিত বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

