কল্পনা করুন, আপনি বিমানে উঠে আকাশে উড়ছেন। হঠাৎ জানতে পারলেন, যিনি বিমানটি চালাচ্ছেন, তাঁর লাইসেন্স নিয়ে সমস্যা আছে, কিংবা তিনি ভুয়া পাইলটও হতে পারেন। এই মুহূর্তে যাত্রী হিসেবে আপনার মনের অবস্থা কেমন হবে?
এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি কেবল কল্পনার মধ্যে নেই। বাস্তবেও জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস-এ এমন ঘটনার সন্ধান মিলেছে। একাধিক পাইলটের যোগ্যতা-জালিয়াতির অভিযোগ উঠে। প্রথমে একজন বা দুইজন নয়, সাতজন পাইলটের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বিমান কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রাথমিক তদন্তে অন্তত চারজন পাইলটের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের আলামত ধরা পড়ে।
তদন্তে উঠে আসে নানা অবৈধ কর্মকাণ্ড। কেউ প্রয়োজনীয় উড়ানঘণ্টা পূরণ না করেই কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স পেয়েছেন, কেউ লগবুকে একই উড়ানের সময় দুই কলামে দেখিয়ে ঘণ্টা বাড়িয়েছেন। আবার কারো ক্ষেত্রে পরস্পর সাংঘর্ষিক উড়ান সনদ পাওয়া গেছে।
বিমানের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ভাবমূর্তি নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের এভিয়েশন নিরাপত্তা মানও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এতে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন বা ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সির নজরদারি বা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
প্রাথমিক পাঁচ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে যে সাতজন পাইলটের নাম উঠে এসেছে, তারা হলেন—ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান আখন্দ, ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদ, ক্যাপ্টেন আনিস, ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাব, ক্যাপ্টেন নুরউদ্দিন আহমেদ, ক্যাপ্টেন ইউসুফ মাহমুদ এবং ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নুরউদ্দিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমান বর্তমানে বিমানের কর্মী নন। মূলত চারজন পাইলটের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর।
লাইসেন্সের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তাঁদের বিমান চালানো থেকে বিরত রাখার সুপারিশ করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এর মানে, প্রায় ৩৩ বছর ধরে সম্ভবত ‘ভুয়া’ লাইসেন্সধারী পাইলটরা হাজার হাজার যাত্রীর জীবন ঝুঁকিতে রেখে আকাশে চলাফেরা করছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, “পাইলট নিয়োগের সময় কর্তৃপক্ষের অবশ্যই লাইসেন্স ও লগবুক যাচাই করা উচিত। কোনো জটিলতা থাকলে তা সিভিল এভিয়েশনের কাছে নিশ্চিত করতে হবে। যদি চারজন পাইলটের ক্ষেত্রে যাচাই না হয়ে থাকে, তাহলে বিমান কর্তৃপক্ষ এটি এড়িয়ে গেছে।”
ভয়ংকর ই-মেইলেই সব শুরু হয়
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর। ওই দিন বিমানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার কাছে আসে একটি ই-মেইল। প্রেরকের পরিচয় অজানা, তবে অভিযোগগুলো ছিল স্পষ্ট, সংবেদনশীল এবং বিস্ফোরক।
ই-মেইলে বলা হয়, কিছু ফ্লাইট অপারেশন্স ইন্সপেক্টরের বৈধ লাইসেন্স বা শারীরিক সক্ষমতা নেই। কেউ কেউ ফ্লাইং কারেন্সি বজায় না রেখেও পাইলট যাচাই ও অনুমোদনের দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগে বলা হয়, ভুয়া, অসম্পূর্ণ বা অপর্যাপ্ত উড়ান ঘণ্টার ভিত্তিতে লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে। এছাড়া, এটিপিএল যোগ্যতার ক্ষেত্রে পি-১ ও পি-২ কলামে একই উড়ান সময় দ্বৈতভাবে দেখিয়ে ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। প্রায় ৩৫০ ঘণ্টার অমিল শনাক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও তা নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, “আইসিএওর নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী এমন অনিয়ম কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি ফ্লাইট সেফটির জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি। এই কারণেই ই-মেইলটি উপেক্ষা করা যায়নি। মূলত এই এক মেইলেই কেঁপে ওঠে বিমান কর্তৃপক্ষ।”
অভিযোগের সময়রেখা
আমাদের হাতে আসা নথি বলছে, গত ৯ জানুয়ারি রাত ৮টা ৫৪ মিনিটে ফ্লাইট সেফটি বিভাগে আসে অভিযোগসংবলিত একটি ই-মেইল। সঙ্গে কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও সংযুক্ত ছিল।
এরপর ১১ জানুয়ারি সকাল ১০টা ২৩ মিনিটে বিষয়টি ফরোয়ার্ড করা হয় চিফ অব ফ্লাইট সেফটি এনামুল হক তালুকদারের কাছে। ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে অভিযোগটি পৌঁছে প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নওসাদ হোসেন-এর কাছে। এই পর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে জানতে চাওয়া হয়, এ ধরনের ঘটনা অতীতে ঘটেছিল কি না, আর ঘটলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
১৫ জানুয়ারি দুপুর ১টা ১৯ মিনিটে জবাবে জানানো হয়, তদন্ত শাখার রেকর্ড অনুযায়ী পূর্বে এ ধরনের কোনো ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু এখানেই তৈরি হয় প্রথম বড় অসংগতি। পরবর্তী নথিতে উঠে আসে, ফার্স্ট অফিসার আল মেহেদী হাসান ইসলাম ও সাদিয়া আহমেদ-এর শিক্ষাগত সনদ জাল থাকার ঘটনা আগেই প্রতিষ্ঠানের নজরে এসেছিল। অবশেষে, ২২ জানুয়ারি সকাল ১১টা ৩৬ মিনিটে নথিটি পাঠানো হয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও-র কাছে। সেখান থেকে জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ আসে।
অভিযোগে এক মাস, তদন্ত কমিটি গঠন
অভিযোগের সূত্রপাত ৩০ ডিসেম্বর হলেও তদন্ত কমিটি গঠিত হয় ২৮ জানুয়ারি। ওই দিন প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক মো. নওসাদ হোসেন স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে (নম্বর ১৪/২০২৬) চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় মহাব্যবস্থাপক (করপোরেট প্ল্যানিং)। সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে ডেপুটি চিফ (ফ্লাইট সেফটি), উপব্যবস্থাপক (অ্যাকাউন্টস-সিস্টেম অডিট, ফেয়ার অ্যান্ড ফান্ড অডিট) এবং টেকনিক্যাল ও এফওডিসিসি বিভাগের উপব্যবস্থাপক। সদস্যসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন উপব্যবস্থাপক (এওসি)।
কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়, অভিযুক্ত পাইলটদের কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স ইস্যু, রেটিং প্রদান, উড্ডয়ন ঘণ্টায় গরমিল, প্রশিক্ষণ ও অনুমোদন নথি এবং পুরো তদারকি কাঠামোয় কোনো অনিয়ম, জালিয়াতি বা বিধিবহির্ভূত কার্যক্রম হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে। পাশাপাশি, দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরোধমূলক সুপারিশ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়। কমিটিকে এই কাজ শেষ করতে তিন কর্মদিবসের সময় দেওয়া হয়েছিল।
৩ ফেব্রুয়ারি কমিটি তাদের পাঁচ পৃষ্ঠার ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেডের জাল পাইলট লাইসেন্সের প্রাথমিক প্রতিবেদন’ দাখিল করে। প্রতিবেদনে চারজন সদস্যের স্বাক্ষর রয়েছে। এখানে একের পর এক এমন অসংগতি উঠে আসে, যা ককপিট নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাব: দুই সনদ, দুই বাস্তবতা
তদন্তে সবচেয়ে বেশি অসংগতি ধরা পড়ে ক্যাপ্টেন বাসিত মাহতাবের ক্ষেত্রে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগই বিস্তৃত ও দলিলসমৃদ্ধ। মাহতাব ১৯৯৩ সালে সিপিএল পান। তবে তাঁর উড়ান প্রশিক্ষণ ও ফ্লাইং রেকর্ড ঘিরে এমন নথি পাওয়া গেছে, যেখানে একটির সঙ্গে অন্যটির মিল নেই।
- ১৬ এপ্রিল ১৯৯২ ইস্যুকৃত সনদে দেখা যায়, সিপিএল নেওয়ার সময় তাঁর একক উড়ান অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ৩৩ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট, এর মধ্যে ৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিট হেলিকপ্টারে উড্ডয়ন এবং বাকিটা তিনি দ্বিতীয় পাইলট হিসেবে করেছেন। এই তথ্য বিএএফ রেকর্ডে ডুয়াল আওয়ার্স হিসেবে দেখানো হয়েছে।
- ১০ জুন ১৯৯২ আরেকটি সনদ ইস্যু হয় একটি বিমান একাডেমির নামে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি ১৫৫ ঘণ্টা পাইলট ইন কমান্ড (সলো) উড়ান সম্পন্ন করেছেন।
দুটি সনদের মধ্যে ব্যবধান মাত্র ৫৫ দিন, অথচ উড়ান ঘণ্টার ৩৪ ঘণ্টা ও ১৫৫ ঘণ্টা—এই বিপুল পার্থক্য উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মাহতাব বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজের প্রধান বৈমানিক ও প্রশিক্ষক পাইলট। তিনি একই সঙ্গে বোয়িং ৭৭৭ ও ৭৮৭ উড়ানোর অনুমতি প্রাপ্ত একমাত্র পাইলট। গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশ এয়ারলাইন পাইলটস অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৫-২৬ সেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর দায়িত্ব দেশের বাণিজ্যিক পাইলটদের অধিকার ও কল্যাণ রক্ষা করা এবং জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার উড্ডয়ন নিরাপত্তা মান বজায় রাখা।
এতো দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন মাহতাবের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথমেই দাবি করেন, “আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।” এরপর ক্যাপ্টেন মাহতাব বলেন, “বিমানে একটি সিন্ডিকেট আছে। আমি বিমান ও দেশের জন্য কথা বলার কারণে তারা আমাকে অপরাধী বানিয়েছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে বিমানকে একটি গ্রুপ বাপ-দাদার সম্পত্তি বানিয়ে রেখেছে। তারা চায় শুধু তাদের পরিবারের লোকজনই আসুক; বাইরে কেউ না আসুক। সব সময় চেয়েছি বিমান লেভেল প্লেইন ফিল্ড হোক, বড় হোক এয়ারলাইনসটা। এ জন্যই আমাকে অপরাধী বানানো হয়েছে।”
ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান আখন্দ: ২৫০ ঘণ্টার জায়গায় ১৫৪:৩৫
প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান আখন্দের বিরুদ্ধে অভিযোগ আগেও বিমানের নজরে এসেছিল। ৬ আগস্ট ২০২৫ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠিও পাঠায়। তবে প্রতিবেদনের অনুযায়ী, এখনও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
অভিযোগটি গুরুতর: প্রয়োজনীয় ২৫০ ঘণ্টা উড়ান অভিজ্ঞতার পরিবর্তে তিনি মাত্র ১৫৪ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট লগ করেই লাইসেন্স পেয়েছেন। এটি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ভুল নয়; বরং লাইসেন্স ইস্যুর প্রাথমিক শর্ত পূরণ না করেই সিপিএল পাওয়ার মতো গুরুতর অনিয়ম।
ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদ: একই উড়ান সময় দুই কলামে
ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিসের লগবুক নিয়ে অভিযোগ আরও নাটকীয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, উড়ান সময় একই সঙ্গে পি-১ ও পি-২ কলামে এন্ট্রি করা হয়েছে। সাধারণত এই দুই কলামের ব্যবহার আলাদা। একই সময় দুই জায়গায় দেখানো মানে ঘণ্টা হিসাব ফুলিয়ে দেখানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তদন্তকারীরা বলেছেন, এটি কি সাধারণ ভুল নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে ফ্লাইং আওয়ার বাড়ানোর চেষ্টা, তা যাচাই করা জরুরি।
ক্যাপ্টেন আনিস: ২০০ ঘণ্টার আগে সিপিএল
ক্যাপ্টেন আনিসের ক্ষেত্রে তদন্তে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুতর অসংগতি। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর লগবুক অনুযায়ী, তার উড়ান অভিজ্ঞতা ছিল ১৬২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট, অথচ সিপিএল পেতে প্রয়োজন ছিল কমপক্ষে ২০০ ঘণ্টা।
এখন প্রশ্ন হলো, তিনি কি প্রয়োজনীয় ঘণ্টা পূরণের আগেই সিপিএল পেয়েছেন? নাকি পরে সেই ঘণ্টা পূরণ করে লাইসেন্স বৈধ করা হয়েছে? তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানে যোগদানের সময় জমা দেওয়া লগবুক এবং সিএএবি রেকর্ড মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
অভিযুক্ত পাইলটদের সাময়িকভাবে সরানোর সুপারিশ
প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে কমিটি বলেছে, বিষয়টি এতটাই স্পর্শকাতর যে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য ১৫ দিন সময় বৃদ্ধি প্রয়োজন। পাশাপাশি, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্যাপ্টেন ইউসুফ মাহমুদ ছাড়া অন্য অভিযুক্ত পাইলটদের সাময়িকভাবে ফ্লাইট দায়িত্ব থেকে সরানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত হবে এবং বিমানের সম্ভাব্য আইনি ও বীমা ঝুঁকি এড়ানো যাবে।
তদন্ত কমিটির মতে, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাই সর্বোচ্চ গোপনীয়তা ও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা জরুরি। এর মাধ্যমে সত্য উদঘাটন হবে এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও দেশের বিমান চলাচল খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হবে।
তদন্তকালেও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালানো পাইলটরা
সিভিল এভিয়েশনের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পাইলটের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত চলাকালে তাঁকে সব ধরনের উড়ান কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়। কিন্তু বিমান বাংলাদেশে এটি মানা হয়নি; বরং অভিযুক্ত পাইলটরা গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুটে বিমান পরিচালনা করেছেন। নথি অনুযায়ী:
-
২৫ ফেব্রুয়ারি: ঢাকা থেকে জেদ্দা ফ্লাইট (বিজি৩৩৫) পরিচালনা করেন ক্যাপ্টেন মাহতাব। একই দিন ঢাকা থেকে কাঠমাণ্ডু ফ্লাইট (বিজি৩৭৩) পরিচালনা করেন ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান।
-
২৬ ফেব্রুয়ারি: কুয়ালালামপুরগামী ফ্লাইট (বিজি৩৮৬) পরিচালনা করেন ক্যাপ্টেন ইউসুফ, আর মাসকট থেকে ঢাকাগামী ফ্লাইট (বিজি৭২২) পরিচালনা করেন ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস।
অভিযোগ ওঠার পরেও তাঁদের কেউ লন্ডন, কেউ গুয়াংজু, কেউ সিঙ্গাপুর, কেউ কুয়ালালামপুর রুটে দায়িত্ব পালন করেছেন। অভ্যন্তরীণ রুটেও এই অভিযুক্ত পাইলটরা বিমানের ফ্লাইট পরিচালনা চালিয়ে গেছেন।
নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন
তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স হলো একজন বাণিজ্যিক পাইলটের পেশাগত ভিত্তি। এই লাইসেন্স বৈধ না হলে পরবর্তী সব রেটিং, উন্নীতকরণ এবং উড়ান ক্যারিয়ারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এটি কোনো সাধারণ হিসাব-নিকাশের ভুল নয়; বরং পাইলটের পেশাগত বৈধতার ভিত্তি-ই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক ঝুঁকিও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদি আইসিএও বা ইএএসএ মনে করে বাংলাদেশের লাইসেন্সিং ও তদারকিতে গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক রুট অনুমোদন, তদারকি অডিট, কোড-শেয়ার, বিমার বীমা ঝুঁকি এবং বিদেশি এয়ারপোর্ট অপারেশন সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অধিকতর তদন্ত ও নথি যাচাই
প্রাথমিক প্রতিবেদনের পর আরও গভীর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তর থেকে জারি করা আদেশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট পাইলটদের লাইসেন্স ফাইল, লগবুক, প্রশিক্ষণ সনদ, পরীক্ষার ফলাফল ও অনুমোদন নথি যাচাই করে লাইসেন্সের বৈধতা নিশ্চিত করতে হবে।
এই আদেশে সই করেছেন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. হুমায়রা সুলতানা। একই আদেশে ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান আখন্দ, ফারিয়েল বিলকিস আহমেদ, আনিস ও বাসিত মাহতাবের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নতুন করে উল্লেখ করা হয়েছে।
পূর্বেও ভুয়া সনদের ঘটনা
২০২২ সালের ২০ জুন বিমান বাংলাদেশকে একটি চিঠি দেয় বেবিচক। সেখানে বলা হয়, আল মেহেদী ইসলাম নামক পাইলটের দাখিল করা সনদ (ইস্যু নম্বর ২৬/০৯/এফআই/৭৭) বেবিচকের রেকর্ডে খুঁজে পাওয়া যায়নি। অথচ এই সনদ দেখিয়ে তিনি পাইলট লাইসেন্সের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন। বেবিচক এটি ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর সনদ’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই তথ্য সামনে আসার পর বিমান কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়। আল মেহেদী ইসলামের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করা হয় এবং প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয়ের অর্থ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আইনে শাস্তি ও তদন্ত কমিটির গোপনীয়তা
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৭-এর ২৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, আইন, বিধি, এএনও অথবা লাইসেন্স/পারমিটের কোনো শর্ত লঙ্ঘন অপরাধ। এর শাস্তি হতে পারে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড।
একই আইনের ২৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি লাইসেন্স, সনদ বা পারমিট জাল করলে বা জাল করার চেষ্টা করলে সেটিও অপরাধ। শাস্তি একই রকম: সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, অথবা এক কোটি টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড।
তদন্ত কমিটি কথা বলতে নারাজ
তদন্ত কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে গতকাল দুপুর সোয়া ১টায় বলাকা ভবনে গেলে কেউই কথা বলতে রাজি হননি। এরপর সন্ধ্যায় ক্যাপ্টেন ইন্তেখাব হোসাইন, ফ্লাইট সেফটি বিভাগের উপপ্রধান, ফোনে এ বিষয়ে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বক্তব্য দিতে পারেন বিমানের জনসংযোগ কর্মকর্তা। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “পাইলটদের লাইসেন্স দেয় সিভিল এভিয়েশন। এসব অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন। তাদের লাইসেন্সের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এমডি সিভিল এভিয়েশনে চিঠি দিয়েছেন, তবে এখনও কোনো উত্তর আসেনি।”
৩ ফেব্রুয়ারি দাখিল করা প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “ওই প্রতিবেদনে সব বিষয় পরিষ্কার হয়নি। যারা তদন্ত করেছেন, তারা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন। তাই এখনো তদন্ত চলছে।”
প্রশাসনের ব্যাখ্যা
বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের তৎকালীন পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নওসাদ হোসেন বলেছেন,= “অভিযোগ পাওয়ার পর সেইফটি ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাদের প্রশাসনে পাঠানো হয়। তখন এমডি ও সিইও মহোদয়ের অনুমোদনক্রমে প্রাথমিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং হিসেবে কমিটি গঠন করা হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করে তিন দিন সময় দেওয়া হয়েছিল। কমিটি একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে, কিন্তু চূড়ান্তভাবে কাউকে দায়ী করেনি।
তারা কিছু বিষয় পেয়েছে এবং আরো সময় চেয়েছে। পরে আরো সময় দেওয়া হয়েছে এবং চূড়ান্তভাবে সিভিল এভিয়েশনে পত্র পাঠানো হয়। এমডি মহোদয় মনে করেছেন, তাঁদের গ্রাউন্ডেট রাখার প্রয়োজন নেই, তাই তা করা হয়নি।” ড. হুমায়রা সুলতানা, বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও-এর বক্তব্য জানা যায়নি। গতরাতে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

