ঈদের সময় এসে পরিবহন খাতে ‘কৃত্রিম সংকট’ এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তবে এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। দেশে জ্বালানি তেলের তীব্র ঘাটতির কারণে বাস এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক যানবাহন চলাচলে বড় ধরণের সমস্যা তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবহন মালিক ইতোমধ্যেই অগ্রিম টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন, যা সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, “এটি মূলত শেষ মুহূর্তে ভাড়া বাড়ানোর একটি সূক্ষ্ম কৌশল।”
গত কয়েক দিন ধরে সারাদেশে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক যানবাহনগুলো চরম বিপাকে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। নিয়ম অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাস সর্বোচ্চ ২০০–২২০ লিটার এবং লোকাল বাস ৭০–৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। তবে বাস মালিকরা বলছেন, ফিলিং স্টেশনগুলোতে এই পরিমাণ তেল মিলছে না। অনেক পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে চড়া দামে ড্রামে ডিজেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
জ্বালানি সংকট এবং রেশনিং ব্যবস্থার কারণে আসন্ন ঈদে বাসযাত্রা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। লোকসানের আশঙ্কায় অনেক পরিবহন মালিক অগ্রিম টিকিট বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। ফলে সাধারণ যাত্রীদের জন্য স্বাভাবিক ভাড়া এবং নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
ঈদযাত্রায় টিকিট নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ল
ঈদকে সামনে রেখে গত ৩ মার্চ থেকে বরাবরের মতো বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছিলেন পরিবহন মালিকরা কিন্তু মাত্র দুই দিনের মধ্যেই জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট এবং দেশজুড়ে তৈরি অস্থিরতায় থমকে গেল এই কার্যক্রম। লোকসানের আশঙ্কায় অনেক পরিবহন মালিক অগ্রিম টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন।
পরিবহন মালিকদের দাবি, তেলের ঘাটতি বা হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে অগ্রিম টিকিট বিক্রি করলে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে হবে। তাই তারা এখন যাত্রার আগমুহূর্তে সরাসরি টিকিট বিক্রি করার পরিকল্পনা করছেন। তবে সাধারণ যাত্রীরা পরিবহন মালিকদের এই যুক্তিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। যাত্রীদের অভিজ্ঞতা বলছে, ঈদ এলেই ৩৫০ টাকার ভাড়া সহজেই ৫০০ টাকায় পৌঁছে যায়। এবার তেল সংকটের সঙ্গে ঈদ উৎসব মিলিয়ে এই দ্বিগুণ অজুহাতে ভাড়া আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে সাধারণ যাত্রীদের জন্য স্বাভাবিক ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
হানিফ এন্টারপ্রাইজের জেনারেল ম্যানেজার মোশাররফ হোসেন জানান, “আমরা অনলাইনে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছি। তবে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কীভাবে হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।”
ঈদযাত্রায় মালিকদের লোকসান
দূরপাল্লার আন্তঃজেলা পরিবহনের এক মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিজের অসহায়ত্ব জানালেন। তার ২০টি বাস রয়েছে। তিনি বলেন, শুরুতে নির্ধারিত দামেই অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছিলাম। কিন্তু তেলের তীব্র সংকট সব পরিকল্পনা উল্টেপাল্টে দিয়েছে। প্রতিদিন একটি বাসের জন্য যেখানে ১০০ লিটার তেল প্রয়োজন, গত দুদিনে পেয়েছি মাত্র ৩০ ও ২০ লিটার। রোববার রাতে কোনো তেলই পাইনি। বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে ১২৫ টাকা লিটারে ড্রামে তেল কিনে আজকের ট্রিপ চালাতে হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “এভাবে লোকসান দিয়ে বাস চালানো অসম্ভব। সরকার রেশনিংয়ের কথা বললেও পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এমন অনিশ্চয়তায় ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রি করার সাহস পাই না। তেলের দাম বাড়লে সেই লোকসান কে বহন করবে?”
অগ্রিম টিকিট না পেয়ে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, তেল সংকটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা মূলত বাড়তি ভাড়া আদায়ের ফন্দি আঁটছেন। ফলে ৩৫০ টাকার ভাড়া সহজেই ৫০০–৬০০ টাকায় পৌঁছাতে পারে। এটি ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও পকেট কাটার নতুন পথ তৈরি করবে।
জ্বালানি সংকটের কারণে অগ্রিম টিকিট বিক্রি ব্যাহত হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নে হানিফ এন্টারপ্রাইজের জেনারেল ম্যানেজার মোশাররফ হোসেন বলেন, “আমরা অনলাইনে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছি। তবে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কী হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।”
অন্যদিকে, শ্যামলী এনআর ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ চলমান সংকটের গভীরতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “তেল একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না তা নয়, তবে নিয়মিত সাপোর্ট দেওয়া তিন-চারটি ফিলিং স্টেশনে যাত্রীদের মতো দাঁড়িয়ে অনেক কষ্টে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এটি আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই সংকট যদি আরও দীর্ঘ হয় এবং সরকার দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারে, তবে ঈদের সময় বড় ধরনের বিপর্যয় আসা অবশ্যম্ভাবী। শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ আরও বলেন, “আমরা ইতোমধ্যেই অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছি। তেলের দাম বাড়লেও যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করার কোনো সুযোগ নেই, এবং আমরা তা করব না। তবে এর ফলে আমাদের বড় অঙ্কের লোকসান হবে।”
বর্তমানে বাসগুলো আর অগ্রিম টিকিট দিচ্ছে না। কাউন্টারে জানানো হচ্ছে, যাত্রার ঠিক আগে টিকিট বিক্রি করা হবে। কিন্তু ঈদের ভিড়ে টিকিট পাওয়া কতটা সম্ভব, তা এখনও অনিশ্চিত। বর্তমানে ৩৫০ টাকার ভাড়া ঈদে ৫০০–৬০০ টাকা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় সাধারণ যাত্রীদের উদ্বেগ বাড়ছে।
টিকিট নিয়ে ‘লুকোচুরি’, শঙ্কায় যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা
ঈদযাত্রার আগে টিকিট সংক্রান্ত মালিকদের সিদ্ধান্তে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। জামালপুর রুটের যাত্রী রিপন মাহমুদ বলেন, “এই রুটের বাসগুলো এখন আর অগ্রিম টিকিট দিচ্ছে না। কাউন্টার থেকে জানানো হচ্ছে, যাত্রার ঠিক আগে টিকিট বিক্রি করা হবে। কিন্তু ঈদের ভিড়ে টিকিট পাওয়া কতটা সম্ভব, তা কি তারা বোঝে? এখন যা ৩৫০ টাকা, ঈদে তা হয়ে যাবে ৫০০–৬০০ টাকা। টাকা দিলেও টিকিট পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে।”
জ্বালানি সংকট এবার নতুন এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “এই পরিস্থিতি নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় নেই বলে মনে হয়। তেল সংকটকে পুঁজি করেই ভাড়া নৈরাজ্য চরমে উঠবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কয়েকগুণ বাড়বে।”
লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা এলাকার যাত্রী জুয়েল রানা বলেন, “আগে অনলাইনে টিকিট না পেলেও কাউন্টারে পাওয়া যেত। এবার অর্ধেক টিকিট অনলাইনে ছাড়ার পর মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে। এখন কাউন্টারে গেলে বাড়তি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় শঙ্কা হলো, বাস আদৌ ছাড়বে কি না, তা নিয়েই। সবসময় বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয় না, ঈদই একমাত্র ভরসা। আগে ভোগান্তি হতো সড়কে, এবার যাত্রা শুরুর আগেই টিকিট নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরু হয়েছে। অথচ এসব দেখার কেউ নেই।”
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “বাসের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ঈদযাত্রার গন্তব্যও নিশ্চিত করা যাবে না। ঈদের সময় বাসগুলো বিরতিহীনভাবে ট্রিপ দেয়। এবার জ্বালানি সংকট এক নতুন সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে, যা নীতিনির্ধারকদের (মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব) ভাবনায় নেই বলে মনে হয়। এই পরিস্থিতি পুঁজি করে ভাড়া নৈরাজ্য চরমে উঠবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে।”
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম পরিস্থিতির গুরুতরতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “সরকার তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করলেও পাম্পে উপচে পড়া ভিড়ের কারণে কর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এই সমস্যা ঠিক না হলে ঈদযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। কারণ, গাড়ি পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলে টার্মিনালে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের দুর্ভোগের সীমা থাকবে না।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ আশ্বাস দেন, “আমরা ভাড়ার বিষয়টি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে এক পয়সাও বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে নন-এসি বাসের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই ভাড়া বাড়ানো যাবে না। জ্বালানির দাম না বাড়লে অগ্রিম টিকিট বন্ধ রাখার কোনো অর্থ নেই, কারণ নতুন ঘোষণা ছাড়া কেউ বাড়তি ভাড়া আদায় করতে পারবে না।”তিনি আরও যোগ করেন, “জ্বালানির দাম বাড়লেও বিআরটিএতে বৈঠক করে অনুমোদন ছাড়া ভাড়া বাড়ানো সম্ভব নয়।”
জ্বালানি মজুতের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে ডিজেলের মোট মজুত ক্ষমতা ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন। ৮ মার্চ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে মজুত আছে ১ লাখ ২০ হাজার ২৩৭ টন ডিজেল। দেশের দৈনিক গড় চাহিদা ৯ হাজার ২২ টন। এই হিসেবে, বর্তমান মজুত দিয়ে প্রায় ১৩ দিন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব।
তবে বিপিসি আশা জাগানো তথ্যও দিয়েছে। সংস্থার মতে, আগামী ১৩ মার্চের মধ্যে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল নিয়ে পাঁচটি জাহাজ দেশে পৌঁছাবে। এই নতুন সরবরাহ যুক্ত হলে মজুতের পরিমাণ বেড়ে যাবে এবং তা দিয়ে আরও প্রায় ১৬ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।

