কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুলে নির্মাণাধীন বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) শুঁটকিপল্লি প্রকল্পে কাজের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জান্নাত এন্টারপ্রাইজ। নির্মাণ কাজে রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন উপকরণ কম সরবরাহ করা এবং নিম্নমানের ইট ও বালু ব্যবহার করে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্পের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগসাজশে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এসব অনিয়ম করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন নিম্নমানের কাজ হয়েছে, অন্যদিকে ভবনের স্থায়িত্ব নিয়েও দেখা দিয়েছে আশঙ্কা। ফলে তদন্ত করে প্রয়োজন হলে ঘরগুলো পুনর্নির্মাণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার অংশ হিসেবে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ এলাকা অধিগ্রহণ করে সরকার। এর ফলে সেখানে বসবাসকারী ৪ হাজার ৬০৯ পরিবারকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাদের জন্য কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুলে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। একই সঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সেখানে শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
২০২০ সালের ৩ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। প্রায় ২২ হাজার ৮৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এবং বছরে প্রায় সাত হাজার মেট্রিক টন নিরাপদ শুঁটকি মাছ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে প্রকল্পের ঘর নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের দাবি, প্রথম ধাপে ১০০টি ঘর নির্মাণের জন্য দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। এর মধ্যে জান্নাত এন্টারপ্রাইজ ৫০টি এবং মেসার্স মোমিনুল হক নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান ৫০টি ঘর নির্মাণের দায়িত্ব নেয়। পরে প্রতিষ্ঠান দুটি সাব-ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে কাজ করায়। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ না করে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় অর্ধকোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
সাব-ঠিকাদারদের দাবি, পর্যাপ্ত উপকরণ না পাওয়ায় তারা কাজ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন। অনিয়মের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানালেও কোনো প্রতিকার পাননি। বরং জান্নাত এন্টারপ্রাইজের মালিক তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছেন বলেও অভিযোগ তুলেছেন তারা।
সাব-ঠিকাদার রকিবুল ইসলাম স্বপন জানান, নির্মাণ কাজে যে পরিমাণ ইট, রড, সিমেন্ট, কংক্রিট ও বালু ব্যবহারের কথা ছিল, তার বেশিরভাগই সরবরাহ করা হয়নি। তার অভিযোগ, জান্নাত এন্টারপ্রাইজের মালিক সাইফ উদ্দিন প্রয়োজনের তুলনায় কম রড ও সিমেন্ট দিয়ে অতিরিক্ত স্থানীয় বালু ব্যবহার করে দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য চাপ দিতেন। বিষয়টি প্রকল্প পরিচালকের কাছে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে চুক্তি বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের ড্রয়িং অনুযায়ী ১০০টি ঘরের জন্য ৯৯ হাজার ৩৮১ কেজি রড ব্যবহারের কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে ৮০ হাজার ৬২৬ কেজি। অর্থাৎ প্রায় ১৮ হাজার ৭৫৫ কেজি রড কম ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাবে ৮ হাজার ৬৫ বস্তা সিমেন্ট দেওয়ার কথা থাকলেও ৩ হাজার ৭৬৫ বস্তা কম দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ৩৪ হাজার ৭৯০ ফুট কনকর খোয়া দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে ২৯ হাজার ১৬ ফুট। ৩ লাখ ২ হাজার ১২০টি ইট ব্যবহার করার কথা থাকলেও ব্যবহার করা হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজারটি, যা প্রায় ৫০ হাজার ইট কম। সিলেট স্যান্ড ৮ হাজার ৭২৩ ফুট দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯৮৯ ফুট। বাকি ঘাটতি পূরণে ব্যবহার করা হয়েছে ৮ হাজার ১৪২ ফুট স্থানীয় বালু। হিসাব অনুযায়ী, এভাবে ১০০টি ঘর নির্মাণে প্রায় ৫৮ লাখ ৬৪ হাজার ৫২০ টাকা আত্মসাৎ হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘর নির্মাণে কাজ করা রাজমিস্ত্রি মো. শাহ আলম বলেন, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম নতুন কিছু নয়। আমরা মিস্ত্রি, যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেভাবেই কাজ করেছি। তার দাবি, রড ও সিমেন্ট কম ব্যবহার করে ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। তাছাড়া এলাকাটি লবণাক্ত হওয়ায় নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করলে এসব স্থাপনা মেয়াদের আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ভবনগুলো পরীক্ষা করলে নিম্নমানের কাজের প্রমাণ পাওয়া যাবে বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে জান্নাত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সাইফ উদ্দিন ফোনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কাজের কোনো অনিয়ম হলে প্রকল্প পরিচালক ব্যবস্থা নেবেন। সাংবাদিকদের এ বিষয়ে কী কাজ—এমন মন্তব্যও করেন তিনি।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. সামসুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে দুদকের সমন্বিত কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

