এম এস রহমান, পাবনা প্রতিবেদক
দুধ উৎপাদনের প্রধান অঞ্চল হিসেবে পরিচিত উত্তরের জেলা পাবনা। এখানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য খামার। এখানকার উৎপাদিত দুধ ও ঘির সুনাম দেশজুড়ে। পাবনার ঘি বিদেশেও রপ্তানি হয়। দুধ ও ঘি উৎপাদনকে কেন্দ্র করে পাবনায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য কারখানা। এতে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারো মানুষের। অনেকের সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে এই ব্যবসার মাধ্যমে।
তবে সেই সুনামের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির মুনাফালোভী অসাধু চক্র বেছে নিয়েছে অবৈধ পথ। তারা ভেজাল দুধ ও ঘি উৎপাদন করে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছে। বিশেষ করে রমজান মাস ও ঈদকে সামনে রেখে ভেজালকারীদের ব্যবসা জমজমাট হয়ে ওঠে। ফলে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ পর্যন্ত।
ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে একের পর এক ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করা হলেও কমছে না ভেজাল দুধ ও ঘি উৎপাদন। সম্প্রতি ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলায় অভিযান চালিয়ে কয়েকজন ভেজাল দুধ ও ঘি ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

যেসব এলাকায় ভেজাল দুধের কারখানা
জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলাকে বলা হয় দুধের রাজধানী। প্রচুর কাঁচা ঘাস উৎপাদন হওয়ায় এ অঞ্চলে অসংখ্য দুগ্ধ খামার গড়ে উঠেছে। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী আসল দুধ ও ঘি উৎপাদন করলেও অনেকে ভেজাল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ভেজাল দুধ ও ঘি উৎপাদনের অভিযোগ রয়েছে।
আসল দুধের পাশাপাশি ভেজাল দুধ ও ভেজাল ঘির ব্যবসা করে এসব এলাকায় শূন্য থেকে কোটিপতি বনে গেছেন অনেক ফড়িয়া ব্যবসায়ী। এসব ভেজাল দুধ ও ঘি বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে রাজধানীসহ সারাদেশে সরবরাহ হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, নামীদামি বিভিন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী কোম্পানির চিলিং সেন্টারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মীদের যোগসাজশে ভেজাল দুধের ব্যবসা চলছে। আবার ভেজাল ব্যবসায়ীরা স্থানীয় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’ করেই নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই ব্যবসা এতটাই লাভজনক যে, অল্প কিছুদিন আগের কারখানার শ্রমিকও এখন কোটিপতি হয়ে গেছেন।
“পাবনায় ভেজাল দুধ-ঘি কারখানায় সয়লাব; কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু চক্র”

জেলায় দুগ্ধ খামার ও দুধ উৎপাদনের হিসাব
ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিকভাবে ডেইরি ফার্ম গড়ে উঠেছে চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, বেড়া, সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলায়। দুগ্ধ উৎপাদনকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে।
পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় সাড়ে ৯ হাজারের বেশি খামারি গাভী পালন করেন। বছরে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন দুধ উৎপাদিত হয়। জেলার বার্ষিক চাহিদা ২ লাখ ৬৬ হাজার মেট্রিক টন। ফলে বছরে প্রায় ৭৪ হাজার মেট্রিক টন দুধ উদ্বৃত্ত থাকে।
উৎপাদিত দুধের ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশ প্রাণ, মিল্কভিটা, আফতাব, আকিজ, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান তাদের চিলিং সেন্টারের মাধ্যমে কিনে নেয়।
কী দিয়ে তৈরি হয় ভেজাল দুধ ও ঘি
সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করে জানা গেছে, ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা-বাঘাবাড়ি সড়কের পাশে বড়াল নদীর তীরে ডেমরা দুগ্ধপল্লী গড়ে উঠেছে। নতুন-পুরোনো মিলিয়ে এখানে প্রায় ৫০টি কারখানা রয়েছে। অধিকাংশ কারখানায় স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নেই। নদী বা ডোবার নোংরা পানি দিয়েই উৎপাদন কাজ চালানো হয়।

নকল দুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়— ননী বা ফ্যাট তুলে নেওয়া পাতলা দুধের সঙ্গে পানি, সয়াবিন তেল, ডালডা, গ্লুকোজ, স্যাকারিন, ইউরিয়া, ডিটারজেন্ট পাউডার, কস্টিক সোডা, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ও রাসায়নিক জেলি।
ঘি তৈরিতেও সয়াবিন তেল, পাম অয়েল, পশুর চর্বি, ভেজিটেবল ফ্যাট, আলুর পেস্ট, রং ও কৃত্রিম ফ্লেভার ব্যবহার করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কারিগর।
ভেজালকারীরা কোটিপতি
স্থানীয়দের মতে, ভেজাল দুধ ও ঘির ব্যবসা করে অনেক দিনমজুর ও ফড়িয়া কয়েক বছরের মধ্যেই কোটিপতি হয়ে গেছেন। তাদের অনেকেই নিজস্ব পিকআপ ভ্যানে বিভিন্ন জেলায় দুধ ও ঘি পাঠান। আবার কেউ নাইট কোচে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন।
প্রশাসনের অভিযান
প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালালেও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না এই অবৈধ ব্যবসা। গত ৯ মার্চ ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা বাজারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ অভিযান চালিয়ে নকল দুধ তৈরির প্রমাণ পায়।

এ সময় তিনটি প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক, ভেজাল ডালডা ও পাউডার জব্দ করা হয়। কেয়া ডেইরির মালিক আয়েশা সিদ্দিকা কেয়াকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়; অনাদায়ে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ইফতেখার মাহমুদ বলেন, “এই ধরনের ভেজাল দুধ বা ঘিতে কোনো পুষ্টিগুণ নেই। দীর্ঘদিন খেলে ডায়রিয়া, লিভার ও কিডনির জটিলতা এমনকি ক্যানসারও হতে পারে।”
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. সালেহ্ মুহাম্মদ আলী বলেন, “ডিটারজেন্ট ও হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড অত্যন্ত ক্ষতিকর রাসায়নিক। এগুলো শরীরে গেলে খাদ্যনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমনকি শিশুর মৃত্যুও ঘটতে পারে।”
শিশুখাদ্যে এমন ভেজাল অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, “খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। এখানে কোনো ভেজাল মেনে নেওয়া যায় না।”

