বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা প্রায়ই বড় কোনো ‘সমস্যা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দুর্নীতি একক কোনো ঘটনার ফল নয়। এটি বহু খাত, বহু প্রক্রিয়া এবং নানা স্তরের জটিলতার সমন্বয়ে তৈরি একটি কাঠামোগত সমস্যা। ফলে এর সমাধানও একক কোনো পদক্ষেপে সম্ভব নয়। প্রয়োজন খাতভিত্তিক, ধাপে ধাপে এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগ।
রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা সেবামূলক খাত—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুর্নীতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যায়। কোথাও প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেওয়া, কোথাও স্বচ্ছতার ঘাটতি, আবার কোথাও জবাবদিহির অভাব দুর্নীতিকে শক্তিশালী করে তোলে। এসব সমস্যাকে একসঙ্গে মোকাবিলা করার কথা বলা সহজ হলেও বাস্তবে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন।
দুর্নীতি মোকাবিলায় বড় বড় ঘোষণা বা সামগ্রিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার চেয়ে নির্দিষ্ট খাতকে লক্ষ্য করে সংস্কার শুরু করা বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া, ভূমি প্রশাসন, ব্যাংকিং খাত বা উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানো গেলে ধীরে ধীরে দুর্নীতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
দুর্নীতি একটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা হওয়ায় এর বিরুদ্ধে লড়াইও দীর্ঘমেয়াদি হতে বাধ্য। তাই সবকিছু একসঙ্গে বদলে ফেলার প্রতিশ্রুতি অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। বরং ছোট ছোট ক্ষেত্র চিহ্নিত করে সেগুলোতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা গেলে ধীরে ধীরে বড় সমস্যাটিকেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
এ কারণে অনেকেই মনে করেন, দুর্নীতির বিশাল ‘পাহাড়’ সরানোর কথা বলে থেমে থাকার চেয়ে ছোট ছোট ‘ঢিবি’ সরানোর কৌশলই হতে পারে কার্যকর পথ। প্রতিটি খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের ছোট ছোট উদ্যোগ একসময় বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। ধাপে ধাপে এগোনোর এই পদ্ধতিই শেষ পর্যন্ত দুর্নীতির জটিল কাঠামো ভাঙার বাস্তবসম্মত উপায় হতে পারে।
বাংলাদেশে দুর্নীতির আলোচনা শুরু হলেই কিছু পরিচিত শব্দ সামনে আসে ‘প্রাতিষ্ঠানিক’, ‘ব্যবস্থাগত’, ‘সর্বব্যাপী’। এসব বর্ণনা পুরোপুরি ভুল নয়। তবে এই ধরনের ভাষা অনেক সময় সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের অসহায়তার অনুভূতি তৈরি করে। কারণ যখন দুর্নীতিকে একটি বিশাল ‘পাহাড়’ হিসেবে কল্পনা করা হয়, তখন সেটি সরানোর চিন্তাটাই অনেকের কাছে প্রায় অসম্ভব মনে হয়।
কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গি যদি একটু বদলানো যায়, তাহলে চিত্রটি ভিন্ন হতে পারে। দুর্নীতিকে যদি অচল এক বিশাল পাহাড় হিসেবে না দেখে বরং অসংখ্য ছোট ছোট ‘টিলা’ বা ‘ঢিবি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় যেগুলো বিভিন্ন খাত ও প্রক্রিয়ার মধ্যে আলাদাভাবে তৈরি হয়েছে ,তাহলে সমস্যাটিকে নতুনভাবে বোঝা সম্ভব। একই সঙ্গে এটিকে কেবল রাজনৈতিক সংকট হিসেবে না দেখে ব্যবস্থাপনার একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তখন সমাধানের পথও আরও বাস্তবসম্মত হয়ে উঠতে পারে।
দুর্নীতি মোকাবিলায় এমন দৃষ্টিভঙ্গির কথাই তুলে ধরেছেন গবেষক মার্ক পায়ম্যান এবং পল এম হেইউড। তাঁদের বই সেকশন–বেজড অ্যাকশন এগেইনস্ট করাপশন এ বলা হয়েছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে খাতভিত্তিক পদ্ধতিতে এগোনো দরকার। অর্থাৎ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভূমি প্রশাসন, পুলিশ বা অবকাঠামোর মতো প্রতিটি খাতে আলাদা করে দুর্নীতির ঝুঁকি শনাক্ত করতে হবে। এরপর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে এগোতে হবে।
এই ধারণাকে তাঁরা একটি কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করেছেন, যার নাম ‘সেরা’ বা (এসইআরএ) পদ্ধতি। এটি চারটি ধাপের সমন্বয়ে গঠিত একটি কর্মপদ্ধতি—
- এস—সেক্টর (Sector): প্রথম ধাপে নির্দিষ্ট খাত নির্বাচন করা হয়। অর্থাৎ কোথায় দুর্নীতির ঝুঁকি বেশি এবং কোথা থেকে কাজ শুরু করা যুক্তিযুক্ত—তা নির্ধারণ করা।
- ই—এক্সপোজার (Exposure): নির্বাচিত খাতে দুর্নীতির ঝুঁকি, দুর্বলতা ও সম্ভাব্য ফাঁকফোকর শনাক্ত করা।
- আর—রেসপন্স (Response): শনাক্ত করা সমস্যাগুলোর ভিত্তিতে প্রতিকারমূলক পরিকল্পনা তৈরি করা।
- এ—অ্যাকশন (Action): পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা এবং তার ফলাফল মূল্যায়ন করা।
এই পদ্ধতির মূল ধারণা হলো দুর্নীতিকে একসঙ্গে সর্বত্র মোকাবিলা করার চেষ্টা না করে ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট খাতকে কেন্দ্র করে কাজ করা। এতে সমস্যার উৎস পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করা যায় এবং সমাধানও তুলনামূলকভাবে বাস্তবমুখী হয়। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে, সেখানে এমন খাতভিত্তিক পদ্ধতি কতটা কার্যকর হতে পারে সেই প্রশ্নটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। এই নিবন্ধে সেই প্রাসঙ্গিকতা এবং সম্ভাব্য প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে।
নাগরিক অভিজ্ঞতায় প্রতিফলিত দুর্নীতি
বাংলাদেশে দুর্নীতি কোনো বিমূর্ত সূচক নয়; এটি নাগরিকের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সরকারি হাসপাতালে একটি বেড পেতে অতিরিক্ত অর্থ দাবি, ভূমি অফিসে নামজারি দীর্ঘদিন আটকে থাকা, ঠিকাদারি কাজে অস্বচ্ছতা কিংবা থানায় অভিযোগ নিতে গড়িমসি এসবই দুর্নীতির বাস্তব ও দৃশ্যমান রূপ।
বিভিন্ন খাতে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই ধরনের। অনেকেই মনে করেন, দুর্নীতি এড়িয়ে সরকারি সেবা পাওয়া এখনো কঠিন। রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায়িত্ব মূলত দেওয়া হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন–কে। তবে বাস্তবতা হলো, দেশের প্রতিটি খাতের দুর্নীতি একসঙ্গে মোকাবিলা করা এই প্রতিষ্ঠানের জন্য সহজ কাজ নয়।
এর একটি বড় কারণ হলো দুর্নীতি সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো খাতের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার ভেতরে ঘটে। অর্থাৎ সমস্যা তৈরি হয় সেই ব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতা থেকে। ফলে বাইরের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সব খাতের প্রক্রিয়াগত জটিলতা দ্রুত বুঝে সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ে। তার ওপর ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক মামলার ভারে প্রতিষ্ঠানটি অনেকটা চাপের মধ্যেই কাজ করছে।
বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই এর ফলাফল সামনে আসে কোথায় কত অর্থ অপচয় হলো বা কে কী সুবিধা নিল। কিন্তু দুর্নীতির পেছনের প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা নিয়ে বিশ্লেষণ তুলনামূলক কম হয়। এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রক্রিয়ার ভেতরের ঝুঁকি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা গেলে সমস্যাটিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।
দুর্নীতিকে কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। এটি একই সঙ্গে একটি ব্যবস্থাপনার ইস্যুও। যেমন রাষ্ট্র বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি, আর্থিক ঝুঁকি বা পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে, তেমনি দুর্নীতির ঝুঁকিকেও একটি ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।
এই বাস্তবতায় কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা খাতে দুর্নীতি অনুসন্ধানের সময় কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনা প্রয়োজন। যেমন স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির প্রকৃতি কী? ভূমি প্রশাসনের কোন ধাপে ফাঁকফোকর রয়েছে? অবকাঠামো নির্মাণে কোন পর্যায়ে অনিয়মের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
এ ধরনের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকেই শুরু হতে পারে কার্যকর সংস্কার। কারণ সমস্যার উৎস পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করা গেলে সমাধানের পথও আরও বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠে। ছোট ছোট খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত্তিও তৈরি করা সম্ভব।
সেরা’ কী:
‘সেরা’ মূলত একটি খাতভিত্তিক (সেক্টর–বেজড) কাঠামো, যার মাধ্যমে দুর্নীতিকে বাস্তব প্রক্রিয়ার ভেতরে শনাক্ত করে মোকাবিলা করার চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ ‘দেশে দুর্নীতি আছে’ এই সাধারণ বক্তব্যের পরিবর্তে কোন খাতে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন ধাপে দুর্নীতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা নির্দিষ্টভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এই পদ্ধতি চারটি ধাপে কাজ করে সেক্টর, এক্সপোজার, রেসপন্স ও অ্যাকশন।
সেক্টর: খাত নির্বাচন
প্রথম ধাপে একটি নির্দিষ্ট খাত নির্বাচন করা হয় যেমন স্বাস্থ্য, ভূমি প্রশাসন, শিক্ষা, পুলিশ বা অবকাঠামো উন্নয়ন। এর উদ্দেশ্য হলো সমস্যাটিকে সীমাবদ্ধ ও স্পষ্ট করা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উদাহরণ হিসেবে ভূমি প্রশাসনের কথা বলা যায়। এখানে নাগরিকদের অভিজ্ঞতা প্রায়ই নেতিবাচক। নামজারিতে দীর্ঘসূত্রতা, রেকর্ড সংশোধনে অনিয়ম এবং দালাল চক্রের প্রভাব এসব অভিযোগ বহুদিনের।
খাত নির্ধারণের মাধ্যমে সমস্যাটিকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনা যায়। এতে কয়েকটি সুবিধা তৈরি হয়। প্রথমত, কোন মন্ত্রণালয় বা দপ্তর দায়বদ্ধ তা স্পষ্ট হয়। দ্বিতীয়ত, তথ্য সংগ্রহ তুলনামূলক সহজ হয়। তৃতীয়ত, বাস্তবসম্মত সমাধান নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
এক্সপোজার: ঝুঁকি উন্মোচন
দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচিত খাতের ভেতরে দুর্নীতির নির্দিষ্ট ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়। এখানে প্রশ্ন করা হয়—দুর্নীতি কোন প্রক্রিয়ায় ঘটছে, কোথায় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, কোন ধাপে স্বচ্ছতা কম এবং কারা এর সুবিধাভোগী।
উদাহরণ হিসেবে স্বাস্থ্য খাত ধরা যেতে পারে। সাধারণ অভিযোগ থাকে—হাসপাতালে দুর্নীতি হয়। কিন্তু এই ধাপে বিশ্লেষণ করা হয়, ওষুধ ক্রয়ে অতিমূল্য নির্ধারণ হচ্ছে কি না, যন্ত্রপাতি কেনায় দরপত্রে কারসাজি হয়েছে কি না, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি সেবায় প্রভাব ফেলছে কি না অথবা অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন রোগীর প্রবেশাধিকার সীমিত করছে কি না।
এই পর্যায়ে তথ্য বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা বৈঠক, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে নাগরিক মতামত নেওয়া হয়। লক্ষ্য থাকে দুর্নীতির প্রকৃত দুর্বল জায়গাগুলো শনাক্ত করা। বাংলাদেশে প্রায়ই দুর্নীতির ফলাফল নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু প্রক্রিয়ার দুর্বলতা বিশ্লেষণ কম হয়। এক্সপোজার ধাপ সেই বিশ্লেষণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে।
রেসপন্স: প্রতিকার পরিকল্পনা
ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পর তৃতীয় ধাপে বাস্তবসম্মত প্রতিকার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। এর মধ্যে থাকতে পারে ই–প্রকিউরমেন্ট চালু করা, নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা বা ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
উদাহরণ হিসেবে অবকাঠামো খাত ধরা যেতে পারে। অনেক সময় দরপত্রের আগেই প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে। এই ক্ষেত্রে প্রতিকার হিসেবে স্বাধীন কারিগরি পর্যালোচনা বোর্ড গঠন, আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে ব্যয় তুলনা করা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকাশ করা এবং নকশা, দরপত্র ও তদারকি প্রক্রিয়া আলাদা রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
একইভাবে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ কমাতে ডিজিটাল অভিযোগ নিবন্ধন, অভিযোগকারীর মোবাইলে স্বয়ংক্রিয় নিশ্চিতকরণ এবং বদলি–পদায়নে স্বচ্ছ মানদণ্ড চালুর মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এই ধাপটি মূলত প্রমাণভিত্তিক ও ব্যবস্থাপনামূলক প্রতিকার পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেয়।
অ্যাকশন: বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন
শেষ ধাপ হলো বাস্তবায়ন। এখানে পরিকল্পনাগুলো কার্যকর করা হয় এবং এর অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ, সময়সীমা ঠিক করা এবং ফলাফল মূল্যায়ন এই ধাপের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশে সংস্কারের একটি বড় দুর্বলতা হলো নীতিপত্র তৈরি হলেও অনেক সময় বাস্তবায়ন হয় না। তাই ‘সেরা’ কাঠামোর সবচেয়ে কঠিন ধাপ হলো অ্যাকশন। এখানে বাস্তব প্রয়োগই মূল লক্ষ্য।
উদাহরণ হিসেবে ভূমি প্রশাসনে নামজারি আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে একটি অনলাইন ড্যাশবোর্ডে কত আবেদন সময়মতো নিষ্পত্তি হয়েছে তা প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে জবাবদিহি তৈরি হয় এবং নাগরিকরাও অগ্রগতি দেখতে পারেন। অ্যাকশন ধাপের অর্থ কেবল উদ্যোগ নেওয়া নয়; বরং ধারাবাহিকভাবে তার অগ্রগতি অনুসরণ করা। নাগরিক সমাজ ও কমিউনিটির সক্রিয় নজরদারি থাকলে এই প্রক্রিয়াটি আরও কার্যকর হতে পারে।
দুর্নীতি মোকাবিলার আলোচনায় ‘সেরা’ পদ্ধতির গুরুত্ব এখানেই যে এটি বিষয়টিকে রাজনৈতিক স্লোগানের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখে না। বরং দুর্নীতিকে একটি ব্যবস্থাপনাগত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী দুর্নীতি কোনো অদম্য ‘পাহাড়’ নয়; এটি বহু ছোট ছোট প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমষ্টি। তাই একসঙ্গে পুরো ব্যবস্থা বদলে দেওয়ার পরিবর্তে খাতভিত্তিক ঝুঁকি শনাক্ত করে ধাপে ধাপে সংস্কার আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গবেষক মার্ক পায়ম্যান এবং পল এম হেইউড তাঁদের বই বেজড অ্যাকশন এগেইনস্ট করাপশন-এ এই ধারণাকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁদের মতে, দুর্নীতিকে যদি ব্যবস্থাপনার একটি ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে তা মোকাবিলার পদ্ধতিও অনেক বেশি বাস্তবভিত্তিক হয়ে ওঠে।
খাতভিত্তিক এই পদ্ধতির বড় শিক্ষা হলো—দুর্নীতি কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনার বিষয়। যেমন রাষ্ট্র নিরাপত্তা ঝুঁকি, আর্থিক ঝুঁকি বা পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রক্রিয়া গড়ে তোলে, তেমনি দুর্নীতির ঝুঁকিও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, নিয়মিত নজরদারি, তথ্য প্রকাশ এবং জবাবদিহির কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব ব্যবস্থা যদি প্রতিটি খাতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠে, তাহলে দুর্নীতি মোকাবিলা কেবল বাহ্যিক চাপের বিষয় হয়ে থাকবে না। বরং তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পেশাগত দায়িত্বে পরিণত হতে পারে।
কার্যকর ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ
এই পদ্ধতি একদিনে ‘দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেয় না। বরং এটি ধাপে ধাপে অগ্রগতির কথা বলে। যেখানে পরিবর্তনের সুযোগ আছে, সেখান থেকেই কাজ শুরু করার পরামর্শ দেয়।
ধরা যাক, প্রতিটি মন্ত্রণালয় যদি নির্দিষ্ট সময় পরপর নিজেদের খাতে দুর্নীতির প্রধান ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে। এরপর সেই ঝুঁকি কমাতে বাস্তবসম্মত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। তাহলে ছোট ছোট পরিবর্তন ধীরে ধীরে বড় প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি কোনো একক ‘পাথরের খণ্ড’ নয়। এটি বহু প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থার জটিল সমন্বয়। ফলে এর সমাধানও হতে হবে খাতভিত্তিক, ধাপে ধাপে এবং বাস্তবতার ভিত্তিতে। বিশাল ‘পাহাড়’ সরানোর প্রতিশ্রুতির চেয়ে ছোট ছোট ‘ঢিবি’ সরানোর কৌশলই হয়তো অধিক কার্যকর পথ হতে পারে।

