দেশের ছাত্রছাত্রীদের জন্য সরকার কর্তৃক বিনামূল্যে সরবরাহিত পাঠ্যবইয়ের টেন্ডার ও ছাপাকাজ নিয়ন্ত্রণ করছে একটি বড় সিন্ডিকেট, যা প্রতি বছর সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ২০২৫ সালের শিক্ষাবর্ষে এই চক্র শুধুমাত্র বই ছাপাকাজে ৬৫৮ কোটি ৮৫ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৫ টাকা লোপাট করেছে।
সিন্ডিকেটটি কৌশলে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়ে টেন্ডার ছাপার সুযোগ দখল করে, কাগজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মূল্য বৃদ্ধি করে, আর্টকার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়। শুধু টেন্ডারেই নয়, তারা কাগজের দাম ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণেরও দায়িত্বে থাকে। কোন প্রেস কোন কাজ পাবে, কাগজের কোন ব্যবসায়ী কতটা কাগজ পাবে—সবই তাদের নিয়ন্ত্রণে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই মুদ্রণ ও বিতরণ নিয়ে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই গণ অভ্যুত্থান পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে বই মুদ্রণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দেশি প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠ্যবই টেন্ডার সিন্ডিকেট শুরু করে। তারা প্রাক্কলিত টেন্ডার মূল্যের তথ্য ফাঁস করে নিজেদের মধ্যে লট ভাগাভাগি করে নেয়। এরপর প্রিন্টিং প্রেসের মালিকরা সরকারের নির্ধারিত বাজেটের ২০–২৫ শতাংশ বেশি হারে দরপত্র দাখিল করে কোটি কোটি টাকা লোপাট করেন।
জুলাই বিপ্লবের আগে প্রাথমিক স্তরের তিনটি শ্রেণির ৭০টি লটের দরপত্রে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাক্কলিত মূল্যের গড়ে ১০ শতাংশ কম দর দাখিল করেছিল। ২০২৫ সালে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৪০ কোটি ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ২০২টি বই মুদ্রণ করা হয়, যার জন্য ব্যয় হয় ২ হাজার ৭৬২ কোটি ৮ লাখ ৯১ হাজার ১৪৪ টাকা।
প্রতিবেদনে সিন্ডিকেটের ভয়াবহ রূপের কথা বলা হয়েছে। কর্ণফুলী আর্ট প্রেস, লেটার এন কালার, অ্যাপেক্স প্রিন্টিং অ্যান্ড কালার, সরকার প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং, অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস, আনন্দ প্রিন্টার্স লিমিটেড, কচুয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, সীমান্ত প্রিন্টিং প্রেস ও প্রমা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স–এই প্রতিষ্ঠানগুলো সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিয়েছে।
এনসিটিবির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রেস মালিকদের কাছে দর ফাঁস করে অনৈতিক সুবিধা দেন। পরে বড় বড় প্রেসের মালিকরা গোপন বৈঠক করে লট ভাগাভাগি, অতিরিক্ত কার্যাদেশ, ও দর সমঝোতা করেন। প্রমা প্রেসের মহসিন, সরকার প্রিন্টিংয়ের দুলাল সরকার, আনন্দ প্রিন্টার্সের রাব্বানী জব্বার, অগ্রণী প্রিন্টিংয়ের রুবেল, কর্ণফুলী আর্ট প্রেসের রবিন ও কাজল এসব সমঝোতার অংশ ছিলেন।
সরকারি সংস্থা বই ছাপাকাজে সিন্ডিকেট রোধে সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—টেন্ডারের প্রাক্কলিত দর ফাঁস রোধে এনসিটিবির সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া এবং বিশেষ সুবিধাভোগী সিন্ডিকেট ভাঙা।
দেশে বর্তমানে ১১৯টি নিবন্ধিত কাগজের মিল রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র কিছু মিলের এনসিটিবি নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সরবরাহের সামর্থ্য আছে। বাকি মিলগুলো কম মানের কাগজ সরবরাহ করে বা অপ্রয়োজনীয় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। ছোট ও মাঝারি প্রিন্টিং প্রেসগুলো এই কাগজ কিনতে বাধ্য হয়, ফলে কাগজের দাম বাড়ে ও বই ছাপার কাজ দেরিতে হয়।
২০২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রিন্টিং প্রেসগুলো প্রায় ২৩টি কাগজ মিল থেকে সরাসরি বা ডিলারদের মাধ্যমে কাগজ সংগ্রহ করেছে। কিন্তু সিন্ডিকেট এই কাগজের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল্য বৃদ্ধি, নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা কামায়।
আর্টকার্ডের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। ২৩০ জিএসএম আর্টকার্ড আমদানির উপর নির্ভরশীল। নিয়ম মেনে আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাট ও ট্যাক্সের কারণে দাম বেশি হয়। কিন্তু সিন্ডিকেট এ আর্টকার্ড গোপনে সংরক্ষণ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বৃদ্ধি করে।
প্রতিবেদনে নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কাগজ ও আর্টকার্ড সিন্ডিকেটে মিন্টু মোল্লা, শেখ সিরাজ, দুলাল সরকার, ওমর ফারুক, মহসিন, রুবেল-রবিন, রাব্বানী জব্বার, দেওয়ান কবির প্রমুখ জড়িত।
সিন্ডিকেটের অভিযোগে লেটার এন কালার লিমিটেডের নির্বাহী রাশেদ হোসাইন বলেন, ‘পাঠ্যবই ছাপাকাজের টেন্ডার আমি নিজেই সম্পন্ন করি। কোনো সিন্ডিকেট বা নেগোসিয়েশন হয় না।’ তবে প্রমা প্রেসের মালিক মামুন হোসেন এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

