মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এই সুযোগে পদ্মা অয়েলের একটি সিন্ডিকেট নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় তেল পরিবহনের সময় অন্তত চারটি গাড়ি থেকে মোট ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল চুরি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পদ্মা অয়েলের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপক (এভিয়েশন) মো. সাইদুল হকের নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে তেলের চুরিতে জড়িত বলে মনে করা হচ্ছে। ঘটনাটি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মা অয়েলের কর্মকর্তাদের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
পদ্মা অয়েলের কর্মকর্তারা জানান, জেট ফুয়েল সাধারণত বিমান জ্বালানির জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু খোলা বাজারে বিক্রির ক্ষেত্রে এটি অকটেনের সঙ্গে মিশিয়ে কম দামে বিক্রি করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল পদ্মা অয়েল ডিপো থেকে চারটি তেলের গাড়ি রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কুর্মিটোলা ডিপোতে যাওয়ার পথে অদৃশ্য হয়ে যায়। গাড়িগুলোর নম্বর: ৪১-০৭০০, ৪২-০২৫২, ৪১-০৬৪৯ এবং ৪১-০৬৯৮।
কাগজে-কলমে গাড়িগুলি কুর্মিটোলা ডিপোতে পৌঁছেছে দেখানো হলেও, বাস্তবে তেল অন্যত্র পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পদ্মা অয়েল কর্মকর্তা জানান, গাড়িগুলো গোদনাইল ডিপো থেকে ছাড়লেও ডিপোতে পৌঁছায়নি। বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকেই অস্বস্তিতে রয়েছেন। তিনি আরও জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলেই চুরির বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব।

চুরির ঘটনা ঢাকনা দেওয়ার জন্য কিছু কর্মকর্তারা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন। সাধারণত তেল বিক্রির সময় কিছু কোম্পানিকে প্রতি লাখে প্রায় এক হাজার লিটার তেল কম দেওয়া হয়। সেই ঘাটতি থেকে চুরি হওয়া তেলের হিসাব মেলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর।
সূত্র জানায়, এই অভিযোগ নতুন নয়। গত বছরের ২০ জানুয়ারি পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ তাকে সতর্ক করে একটি চিঠি দিয়েছিল। কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (পরিচালন ও পরিকল্পনা) মো. আসিফ মালেক স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছিল, ‘আপনার ডিপোর পরিচালনা ও নিয়ম-শৃঙ্খলা সম্পর্কিত বিভিন্ন অভিযোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা কোম্পানির ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। পূর্বে অবহিত করা হলেও প্রত্যাশিত সংশোধন লক্ষ্য করা যায়নি। অতএব, সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে প্রতিষ্ঠানের সকল নিয়ম-কানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করুন। ভবিষ্যতে পুনরায় অভিযোগ পরিলক্ষিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে সতর্কবার্তার পরেও মো. সাইদুল হক একই ধরনের অভিযোগ থেকে বাঁচতে পারেননি। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিতে বিপিসির উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন আহ্বায়ক, বিপিসির ব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মো. বদরুল ইসলাম ফকির সদস্য এবং পদ্মা অয়েলের কর্মকর্তা কে এম আবদুর রহিম সদস্য সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন।
তদন্তে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা আসার পথে চারটি তেলের গাড়ি কাগজে-কলমে কুর্মিটোলা ডিপোতে পৌঁছলেও বাস্তবে তেল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই ঘাটতি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য অন্য কোম্পানিকে কম তেল সরবরাহ করা হয়েছে।
বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানের নির্দেশে কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও সময়মতো প্রতিবেদন দেওয়া যায়নি। তদন্তের অংশ হিসেবে ৮ মার্চ কমিটি কুর্মিটোলা ডিপো পরিদর্শন করে এবং তেল চুরিতে জড়িত থাকার অভিযোগে কর্মকর্তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ চালায়।

পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, “আমি এই অভিযোগটি এইমাত্র শুনেছি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।” আর অভিযুক্ত মো. সাইদুল হককে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তদন্তে আরও প্রকাশিত হয়েছে, সনদ ও স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। ২০১৯ সালে সহকারী ব্যবস্থাপক পদে থাকাকালীন তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময় জাল বেতন সনদ দাখিল করেছিলেন। এছাড়া সংযুক্ত চারটি ভাউচারে সাবেক কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।
অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এবং পূর্ব সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়, কিন্তু কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০২০ সালে উপ-ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। চাঁদপুর ডিপোর ইনচার্জ থাকাকালীনও তেলে ভেজাল মেশানো এবং ডিলারদের কম তেল দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া উঠেছিল।
দুদক সূত্র জানায়, মো. সাইদুল হক পদ্মা অয়েলের সাবেক শ্রমিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এবং বরখাস্তকৃত নেতা মো. আমিনুল হকের ছোট ভাই। ঢাকার বনানী এলাকায় তার দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা। একটিতে পরিবার থাকে এবং অন্যটি ভাড়া দেওয়া হয়। এছাড়া তিনি একটি বিলাসবহুল ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন।

