পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (পিএলএফএসএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. সাগির হোসেন খানের বিরুদ্ধে নতুন করে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি যখন চরম আর্থিক সংকটে ছিল, তখনই এমডি তার ব্যক্তিগত মামলা পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ঘুষ দেওয়া এবং বিলাসী জীবনযাপনে কোম্পানির অর্থ ব্যবহার করেছেন।
অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে, মাত্র ৪৫ জন কর্মী নিয়ে চলা পিপলস লিজিংয়ের এমডি মাসিক বেতন নিচ্ছেন প্রায় ৫ লাখ টাকা। এছাড়া, কোম্পানির তহবিল থেকে ব্যক্তিগত মামলা পরিচালনার জন্য প্রায় ৮৫ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের বক্তব্য, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিষ্ঠানটির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাহত হচ্ছে।
২০২১ সালের ২৯ জুন বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের একক ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ পিপলস লিজিং পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশেষ বোর্ড গঠন করা হয় এবং সেই বোর্ডের অধীনে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, আদালতের নির্দেশনা ও কোম্পানি আইনের বিধান উপেক্ষা করে এমডি সাগির হোসেন খান নিয়মিত বোর্ড সভা ডেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছেন। অনেক সময় এসব সভা রাজধানীর ফাইভ স্টার হোটেলে অনুষ্ঠিত হয় এবং বোর্ড সদস্যরা মোটা অঙ্কের সম্মানী নেন।
ব্যক্তিগত খরচ ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ব্যবহার, ব্যক্তিগত মামলা খরচকে কোম্পানির মামলা হিসেবে দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন এবং অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও এই কর্মকাণ্ড তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করছে।
বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর একটি অফিস নোটে মামলা থেকে মুক্তি পেতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ওই নথিতে এমডি সাগির হোসেনসহ ১৪ কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেছেন। চেক ইস্যু করা হয়েছিল আব্দুল্লাহ আল মাহফুজের নামে। আল মাহফুজ চেক ইস্যুর বিষয়টি স্বীকার করলেও থানায় টাকা দেওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন।
একইভাবে, ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট ‘স্পেশাল তদবির’ শিরোনামে রমনা থানাসহ আইনশৃঙ্খলা সংস্থাকে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকার বিল অনুমোদন করা হয়। এমডি ও তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা এই বিল অনুমোদন করেন। এছাড়া ড্রাইভার বেলালের নামে ৫ লাখ টাকা এবং পিপলস লিজিংয়ের কর্মকর্তা আশিকুর রহমানের নামে ৫ লাখ টাকার চেকও জারি করা হয়েছিল।
কর্মকর্তাদের অগ্রিম অর্থ বিতরণ
প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কর্মকর্তাদের অগ্রিম অর্থ দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- কোম্পানি সচিব আরমিয়া ফকির: ৬০ লাখ ২০ হাজার টাকা
- শেখ রেজওয়ান উদ্দিন: ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা
- মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন: ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা
- সাইফুল ইসলাম: ৬ লাখ টাকা
- ফখরুল ইসলাম: ৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা
- মোক্তাফ হোসেন: ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা
- আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ: ১২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা
- আশিকুর রহমান: ১০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা
মোট অগ্রিম বিতরণ প্রায় এক কোটি টাকার কাছাকাছি।
মামলা ও এমডির রাজনৈতিক সংযোগ
পল্টন থানায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় এমডির নাম ৮৪ নম্বর আসামি হিসেবে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তিনি কোম্পানির প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বিভিন্ন অজুহাতে ব্যবহার করেছেন।
ব্যাংকিং খাতের সূত্রে জানা গেছে, সাগির হোসেন খান আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এছাড়া তিনি সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর রউফ তালুকদার ও বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চুর কাছেও পরিচিত।
সাগির হোসেন খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বলেন, “আদালত আমাকে নিয়োগ দিয়েছে, তাই আদালতের অনুমতি ছাড়া কোনো মন্তব্য করব না।” ব্যক্তিগত মামলার খরচ কেন কোম্পানির ব্যয়ে দেখানো হয়েছে—এ বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, “কোনও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ব্যক্তিগত অপরাধে জড়িত হলে তার খরচ নিজ তহবিল থেকে বহন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে এমন খরচ করা গুরুতর অনিয়ম।” তিনি আরও বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অর্থ দিয়ে মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার অভিযোগ সমাজে খারাপ বার্তা দেয়।”
পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়া জটিল
অভিযোগের কারণে পিপলস লিজিংয়ের বোর্ড কার্যক্রমও প্রশ্নবিদ্ধ। অব্যবহৃত ব্যয়বহুল সভা থেকে বোর্ড সদস্যরা মোটা ফি নিলেও কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিতে বর্তমানে আমানত রয়েছে প্রায় ২,৩৬২ কোটি টাকা, যার মধ্যে ব্যক্তিগত আমানত প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি টাকা। অনেক আমানতকারী দীর্ঘদিন ধরে তাদের টাকা ফেরত না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমডি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেন প্রতিষ্ঠানটির পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করছে। বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তদন্ত ও জবাবদিহির মাধ্যমে তাদের অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন।
সূত্র: শেয়ার বিজ

