অর্থনৈতিক সংকট, বিনিয়োগ মন্দা ও কর্মসংস্থান সংকটের মধ্যেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আহরণ ৮ শতাংশে উন্নীত করতে চাচ্ছে।
দেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধীরগতিতে বাস্তবায়ন হচ্ছে, রপ্তানি কমছে, আর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাপূর্ণ যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর মধ্যেই এনবিআর নতুন কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরকে তা উপস্থাপন করেছে।
বর্তমানে জিডিপির তুলনায় দেশের রাজস্ব আহরণের হার ৬.৬ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও ঋণদাতা সংস্থাগুলোর চাপও রয়েছে রাজস্ব বাড়ানোর বিষয়ে।
সরকার ইতিমধ্যেই ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করেছিল, যা বর্তমানে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে ৩.৬ বিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে। যদিও রিজার্ভ বৃদ্ধির ও বকেয়া পরিশোধের শর্ত পূরণ হয়েছে, রাজস্ব আদায়ে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, রাজস্ব বাড়ানো শুধুমাত্র আইএমএফের জন্য নয়, দেশের নিজস্ব উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। নির্বাচিত সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব জোগান বাড়ানো দরকার।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, “রাজস্ব আহরণে সফল হতে হলে একটি গতিশীল অর্থনীতি থাকা আবশ্যক। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এডিপি বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা স্থবির অবস্থায় রয়েছে।”
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৬৮ শতাংশ, যা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২১.১৮ শতাংশ।
রাজস্ব আহরণ বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাচ্ছে, যা উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে। সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, “এ অবস্থায় ভোক্তার চাহিদা কমে যাবে, অর্থনৈতিক গতি ধীর হবে, আর সরকারের রাজস্ব আদায় মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে।”
এনবিআরের সদস্য আজিজুর রহমান জানান, সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে বড় ধরনের রাজস্ব প্রয়োজন। রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য করের আওতা সম্প্রসারণ, বকেয়া আদায়, ফাঁকি রোধ ও কমপ্লায়েন্স বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের কার্যকারিতা বাড়াতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি জরুরি।
এদিকে করছাড় সুবিধা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ঘাটতি তৈরি করছে। এনবিআর বলছে, করছাড়ের আগে অর্থনৈতিক প্রভাব, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে। স্থায়ী ছাড়ের পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রপ্তানি বা কর্মসংস্থানভিত্তিক সুবিধা দেওয়া হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে করছাড়ের পরিমাণ ছিল ১.৬ লাখ কোটি টাকা।
ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম অনলাইনে করা হচ্ছে। তবে ডিজিটাল লেনদেনের সীমাবদ্ধতা এখনও একটি বড় ফাঁক রেখে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের মাধ্যমে এই ফাঁক কমানো হবে।
বকেয়া রাজস্বও এক বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক বাবদ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া রয়েছে। পেট্রোবাংলার কাছে ২৫ হাজার কোটি, বিপিসির কাছে চার হাজার কোটি, সিভিল অ্যাভিয়েশনের কাছে চার হাজার কোটি টাকা বকেয়া আছে। এই বকেয়া আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রাজস্ব আদায়ে এনবিআর ইতিমধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এজন্য আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস—তিনটি খাতে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। ভ্যাট আদায়ের টাস্কফোর্স ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। কাস্টমসেও বকেয়া আদায় ও ব্যাংক গ্যারান্টির নগদায়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

