দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে উৎপাদনমুখী শিল্প খাত দীর্ঘদিন ধরে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতই পড়েছে বড় ধরনের আর্থিক চাপে। ব্যাংক থেকে নেওয়া বিপুল ঋণের একটি বড় অংশ সময়মতো ফেরত না আসায় বেড়েছে খেলাপি ঋণ, যা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে বিতরণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৬৪ হাজার ১১৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৪৩ শতাংশ।
কিন্তু এই খাতেই খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। শিল্প খাতে বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ ইতিমধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যার পরিমাণ ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।
এক বছরের ব্যবধানে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২২ দশমিক ৮ শতাংশ। মাত্র এক বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ পয়েন্ট, যা শিল্প খাতে আর্থিক শৃঙ্খলার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে।
তবে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও মিলেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এই খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩৭ শতাংশ। তিন মাসের ব্যবধানে ডিসেম্বর শেষে তা কমে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশে নেমেছে। যদিও এই হ্রাস সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে, সামগ্রিক চিত্র এখনো উদ্বেগজনকই রয়ে গেছে।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, এই সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ। বৈশ্বিক মহামারির সময় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সরবরাহব্যবস্থার ভেঙে পড়া এবং উৎপাদন ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল করে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক সুদের হার বৃদ্ধি, যা দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে উদ্যোক্তাদের সংগ্রাম করতে হচ্ছে। অনেকেই নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ শোধ করছেন, আবার কেউ বিকল্প উৎস থেকে অর্থ জোগাড় করছেন। তবে ভবিষ্যতে ব্যবসা পরিস্থিতি উন্নত হলে খেলাপি ঋণ কমতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে ব্যাংকিং খাতের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঋণ বিতরণে নীতিমালা যথাযথভাবে মানা হয় না। বড় ও প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীগুলো অধিকাংশ ঋণ পেয়ে থাকে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ঋণ আদায়ে কঠোরতা দেখা যায় না। এমনকি নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে বিদেশে অর্থ পাচারের ঘটনাও ঘটছে, যা পুনরুদ্ধার করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট আরও বাড়তে পারে। এতে নতুন ঋণ বিতরণ কমে যাবে, শিল্পে বিনিয়োগ ব্যাহত হবে এবং কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি সামাল দিতে সুদের হার বাড়াতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দিতে পারে।

