বিশ্ব বাণিজ্য এখন সমুদ্রপথনির্ভর। বৈশ্বিক পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ আয়তন এবং ৭০ শতাংশ মূল্য এই পথেই পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান উত্তেজনা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, কয়েকটি সংকীর্ণ নৌপথ বন্ধ হলেই কীভাবে বিশ্ব অর্থনীতি চাপে পড়ে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি—যেখান দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়—এখন বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু। এই পথ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে তেলের বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। তবে শুধু হরমুজ নয়, বিশ্বজুড়ে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘চোকপয়েন্ট’ রয়েছে, যেগুলোতে বিঘ্ন ঘটলে বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
নিচে বিশ্বের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো—
হরমুজ প্রণালি
ইরান ও ওমানের মাঝামাঝি অবস্থিত এই পথ পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সংকীর্ণতম অংশ মাত্র ৩৯ কিলোমিটার। প্রতিদিন ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনায় এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ।
বাব আল-মানদেব
ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝখানে অবস্থিত এই পথ লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। প্রতিদিন প্রায় ৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল যায়। বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই পথ দিয়ে হয়। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় রুটটি এখন ঝুঁকিতে।
সুয়েজ খাল
মিশরে অবস্থিত এই কৃত্রিম খাল ভূ-মধ্যসাগর ও লোহিত সাগরকে যুক্ত করেছে। ১৮৬৯ সালে চালু হওয়া এই পথ এশিয়া-ইউরোপ দূরত্ব প্রায় ৮,৯০০ কিলোমিটার কমিয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। ২০২১ সালে একটি জাহাজ আটকে গিয়ে ছয় দিন চলাচল বন্ধ ছিল।
তুর্কি প্রণালি
বসফরাস ও দার্দানেলিস নিয়ে গঠিত এই পথ কৃষ্ণ সাগরকে ভূ-মধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ মিলিয়ন ব্যারেল তেল যায়। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর জন্য এটি প্রধান সামুদ্রিক রুট।
জিব্রাল্টার প্রণালি
স্পেন ও মরক্কোর মাঝখানে অবস্থিত এই পথ আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূ-মধ্যসাগরকে যুক্ত করে। প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। সুয়েজমুখী জাহাজগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।
ড্যানিশ প্রণালি
ডেনমার্ক ও সুইডেনের মধ্যবর্তী এই পথ বাল্টিক সাগরকে উত্তর সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রতিদিন প্রায় ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। রাশিয়ার তেল রপ্তানির জন্য এটি প্রধান রুট।
মালাক্কা প্রণালি
মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এই পথ বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম। প্রতিদিন প্রায় ২৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং চীনের তেল আমদানির ৮০ শতাংশ এই পথনির্ভর।
তাইওয়ান প্রণালি
চীন ও তাইওয়ানের মাঝখানে অবস্থিত এই রুট দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য হয়। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও কন্টেইনার পরিবহনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আঞ্চলিক উত্তেজনায় এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পানামা খাল
পানামার মধ্য দিয়ে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা এই খাল ১৯১৪ সালে চালু হয়। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বড় অংশের কন্টেইনার ট্রাফিক এবং এশিয়ায় রপ্তানি হওয়া অধিকাংশ এলপিজি এই পথ দিয়ে যায়।
উত্তমাশা অন্তরীপ (ক্যাপ অব গুড হোপ)
দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই দীর্ঘ সমুদ্রপথ বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সুয়েজ খাল বা মধ্যপ্রাচ্যের ঝুঁকি এড়াতে জাহাজগুলো এই পথে ঘুরে যায়। এতে যাত্রা ১০ থেকে ১৪ দিন এবং প্রায় ৭,৪০০ কিলোমিটার বাড়ে। প্রতিদিন প্রায় ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথে পরিবাহিত হয়।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এসব নৌপথ শুধু বাণিজ্যের রুট নয়, বরং কৌশলগত শক্তির কেন্দ্র। একটি পথ বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে জ্বালানি বাজার, পণ্য সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে।

