মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। এর সরাসরি প্রভাব এখন বাংলাদেশেও।
সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান মজুত দিয়ে আর মাত্র এক সপ্তাহের মতো চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে বিপিসি। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে ডিজেল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে তিন দিনের ব্যবধানে মোট ১৮ লাখ টন ডিজেল কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান বাজারদরে এই ক্রয়ে যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি ব্যয় গুনতে হচ্ছে।
সরকারি সূত্র জানায়, নিয়মিত সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেটে নির্ভরতা বাড়াতে হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ এবং সরবরাহকারীদের ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণার কারণে নির্ধারিত চালান বিলম্বিত বা স্থগিত হচ্ছে। ফলে তাৎক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরাসরি ক্রয় ছাড়া অন্য পথ খোলা নেই।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের একটি নথি অনুযায়ী, বিপিসির বোর্ড সভায় প্রথম ধাপে ৮ লাখ টন ডিজেল কেনার সিদ্ধান্ত হয়। পরে আরও ১০ লাখ টন কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকংভিত্তিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। সব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের ‘প্ল্যাট রেট’ অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে।
এই দরে ব্যারেলপ্রতি ডিজেলের মূল্য ২১৩ থেকে ২২১ ডলারের মধ্যে উঠানামা করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাজার অত্যন্ত অস্থির। ভবিষ্যতে দর কমলে ব্যয় কমবে, আবার বাড়লে খরচও বাড়বে।
এদিকে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে চাপ বেড়েছে। অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্প মালিকরা। অনেক স্থানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে পাম্প বন্ধের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবে তুলনামূলক বেশি সালফারযুক্ত নিম্নমানের ডিজেলও সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবেই সংকট মোকাবিলায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি বর্তমানে ঝুঁকির মুখে। এ পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ তেল পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের শুরুতে ইরানের বিধিনিষেধ আরোপের ফলে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে জাহাজ ভাড়া, বিমা খরচ ও তেলের দামে।
বাংলাদেশে আমদানিকৃত পরিশোধিত জ্বালানির বেশিরভাগ আসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে, যেগুলো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে না। তবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আনা অপরিশোধিত তেল পুরোপুরি এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ইতোমধ্যে কিছু ট্যাংকার লোডিং জটিলতায় পড়েছে এবং নতুন চালান নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় পরিবহন খাতসহ ডিলার ও পরিবেশকরা অতিরিক্ত মজুত শুরু করেছেন। এতে হঠাৎ করেই বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির মজুত দ্রুত কমে গেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, কয়েকদিন আগেও ১২ দিনের মজুত থাকলেও এখন তা কমে ৭-৮ দিনে নেমে এসেছে।
বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে দিনরাত কাজ করছেন তারা। তাদের ভাষায়, ‘এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে যেকোনোভাবে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।’

