মঙ্গলবার দিনের শুরুতেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরবরাহ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান উত্তেজনা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনা হয়নি। অথচ এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগোচ্ছে এবং খুব দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। ফলে তেলের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে নাটকীয় ওঠানামা দেখা যায়। একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৩ ডলারে উঠে যায়। কিন্তু সমঝোতার সম্ভাবনার কথা জানানো হলে দাম দ্রুত নেমে ৯৬ ডলারে আসে। যদিও এই পতন স্থায়ী হয়নি। পরে আবার দাম কিছুটা বেড়ে মঙ্গলবার সকালে ১০৩ ডলার প্রতি ব্যারেলে দাঁড়ায়। অর্থাৎ আগের দিনের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় প্রায় ১০ ডলার কম।
তেলের দামের এই পরিবর্তনের প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। লন্ডনের শেয়ার সূচক শুরুতে দুই শতাংশের বেশি কমে গেলেও দিনের শেষে প্রায় আগের অবস্থায় ফিরে আসে। একই সময়ে জার্মানি ও ফ্রান্সের বাজারে সামান্য উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সূচকগুলোও ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
অন্যদিকে এশিয়ার বাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে উল্লেখযোগ্য ধস নেমেছে, যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে এই পথ কার্যত বন্ধ রয়েছে।
এর আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হবে। জবাবে ইরানও পাল্টা সতর্ক করে জানিয়েছে, এমন কিছু ঘটলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে আঘাত হানবে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান বিশ্ববাজারে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পরবর্তীতে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, দুই দেশের মধ্যে গভীর ও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে এবং একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধানের দিকে অগ্রগতি হচ্ছে। তিনি পাঁচ দিনের জন্য ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা স্থগিত রাখার কথাও উল্লেখ করেন। তবে এই সিদ্ধান্ত আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে বলেও জানান।
অন্যদিকে ইরান এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার গালিবাফ বলেন, বাজারকে প্রভাবিত করার জন্য ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই ধরনের ভিন্নমুখী বক্তব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে। প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে, আবার তা ভেঙেও যাচ্ছে—ফলে বাজারে স্থিতিশীলতা আসছে না।
তেলের দাম এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ভোক্তারা চাপের মধ্যে রয়েছেন। এমনকি যুদ্ধবিরতি হলেও সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষতি ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা কঠিন হবে।
ইতিমধ্যে এই সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। অনেক দেশে জ্বালানির ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফেইথ বিরল সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে। তিনি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের সময়কার পরিস্থিতির সঙ্গে এর তুলনা করেছেন।
এদিকে যুক্তরাজ্যেও পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্টারমারইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি দ্রুত চালু করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি দেশটির ঋণের সুদহারও বেড়ে গেছে, যা অর্থনৈতিক চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ।

