ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা বাংলাদেশসহ পুরো বিশ্বে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এটি আগের যে কোনো সংকটের চেয়ে বড় ঝুঁকি। ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় তৈরি পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে এখন অনেকটাই কম জটিল। এবার বিপদ বহুমুখী বাংলাদেশের অর্থনীতির দুইটি প্রধান ভিত্তি প্রভাবিত হতে যাচ্ছে: প্রবাসী আয় এবং পোশাক শিল্পের রফতানি।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেল ও পণ্য পরিবহনের খরচ আকাশচুম্বী হয়ে উঠছে। ভৌগোলিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক মন্দা সৃষ্টি হলে রফতানির চাকা থেমে যেতে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রপথে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির ফলে রফতানিকারকরা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবেন।
পোশাক শিল্পে অর্ডারের পতন এবং পরিবহনে বিশৃঙ্খলা মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে। একই সঙ্গে, কোটি কোটি প্রবাসী কর্মীর কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এরা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান উৎস। বাংলাদেশের অর্থনীতির এই দুই স্তম্ভে প্রভাব পড়লে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এক কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হতেই জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের আমদানি ব্যয় তীব্রভাবে বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত শেষ হওয়া অনিবার্য বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
অর্থনৈতিক ঝুঁকির এই সময়ে নতুন প্রশাসন অতীতের পপুলিস্ট বা জনতুষ্টিবাদী নীতি এবং অতিরিক্ত বিলাসী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি দেখাতে পারবে না। স্বৈরাচারী শাসকশৈলীতে, বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রিত মুদ্রানীতি প্রায়শই দেশের নিজের পায়ে কুড়াল মারার মতো ছিল, যা অর্থনৈতিক দুরবস্থা ত্বরান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে এক মৌলিক নীতি হলো ‘ইম্পসিবল ট্রিনিটি’ বা অসম্ভবের ত্রিমিতি। এর অর্থ, একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিনটি লক্ষ্য একসাথে রাখতে পারে না:
- স্থির মুদ্রা বিনিময় হার
- অবাধ মূলধন প্রবাহ
- স্বাধীন মুদ্রানীতি
ধরে নিন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে মুদ্রানীতি চালাতে পারে। তখন তার মূল লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো বা কমানো। যদি একই সঙ্গে অবাধ মূলধন প্রবাহও থাকে, তাহলে দুই লক্ষ্য পূর্ণ হয় (২ ও ৩) কিন্তু স্থির মুদ্রা বিনিময় হার রাখা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে, যদি ব্যাংক মুদ্রা বিনিময় হার স্থির রাখার চেষ্টা করে এবং মূলধন প্রবাহ অবাধ থাকে, তাহলে লক্ষ্য ১ ও ২ পূর্ণ হয়, কিন্তু স্বাধীন মুদ্রানীতি আর বজায় থাকে না।
শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে লুটেরা অর্থনীতিতে এই ত্রিমিতির মৌলিক নিয়ম উপেক্ষা করা হয়েছিল। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মুদ্রানীতি, স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে ব্যর্থতা দেশের অর্থনীতিকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিল।
নয়-ছয়’ নীতি ও মুদ্রানীতির ব্যর্থতা
২০২২ সালের শুরুতে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যের সরবরাহ সংকটে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। এর সঙ্গে আমদানি ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করে। সেই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের বিনিময় হার বাজারের সঙ্গে সমন্বয় না করে ৯০ টাকার আশপাশে আটকে রাখার চেষ্টা করে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি ছিল অর্থনৈতিক চেয়েও বেশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
দেশের মুদ্রার মান কমে যাওয়া যে রাজনৈতিক শাসনের দুর্বলতার প্রতিফলন, তা নতুন কোনো ঘটনা নয়। ইতিহাসে দেখা গেছে, স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থায় প্রভাবশালী নীতি প্রয়োগে এমন আত্মঘাতী মুদ্রানীতি বিরল নয়। একই পথ অনুসরণ করেছিল শেখ হাসিনার সরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংক তখন সুদের হারে ৯ শতাংশের সর্বোচ্চ সীমা বজায় রাখে, অথচ বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম এবং দেশের মূল্যস্ফীতি তুঙ্গে। এ কুখ্যাত ‘নয়-ছয়’ নীতি কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়, বরং এটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষার কৌশল ছিল। মহামারীর সময় এই নীতি চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য ছিল অর্থনীতি চাঙ্গা করার ছদ্মবেশে ধনকুবেরদের পকেটে বড় ভর্তুকি পৌঁছে দেওয়া।
অপরদিকে, ৬ শতাংশের আমানত সীমা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হওয়ায় সাধারণ সঞ্চয়কারীর আসল আয় ঋণাত্মক হয়ে যায়। ফলে তাদের পরিশ্রমে অর্জিত সঞ্চয় ব্যাংকে রাখলেও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। ব্যাংক খাতও এর প্রভাবে ভেতর থেকে পঙ্গু হয়ে পড়ে; এসএমই বা নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ বন্ধ হয়ে যায় এবং শুধু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের দিকে ঝুঁকিতে থাকে। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ব্যবসায়ীরা সস্তা ঋণের সুযোগ নিয়ে বিশাল পরিমাণে টাকা পাচার করে এবং ডলারের বিপরীতে সম্পদ বিদেশে সরিয়ে নেয়। এভাবে মধ্যবিত্তের অর্থ ক্ষয় হয়, আর বড় শিল্পগোষ্ঠীর ব্যাংক ব্যালান্স ফুলে ওঠে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ইম্পসিবল ট্রিনিটি’ বা অসম্ভবের ত্রিমিতির খাঁচায় আটকা পড়ে। মুদ্রা বিনিময় হার স্থির রাখতে গিয়ে আমদানির ওপর কঠোর শর্ত চাপানো হয়, কিন্তু হুন্ডি ও আন্ডার/ওভার ইনভয়েসিংয়ে মূলধন প্রবাহ বন্ধ করা যায়নি। ফলস্বরূপ, বিনিময় হার ও সুদের হার ধরে রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে স্বাধীন মুদ্রানীতি বিসর্জন দিতে হয়। এর করুণ পরিণতি আমরা দেখেছি: বৈদেশিক রিজার্ভ কমে ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে—এক ব্যর্থ কৃত্রিম মান রক্ষার লড়াই।
গণ-অভ্যুত্থান ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পাঠ
২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণ-অভ্যুত্থানের পর বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার ‘অসম্ভবের ত্রিমিতি’ মান্য করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কঠিন পথে চলার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সময়ে ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়ে মুদ্রানীতির স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা হয় এবং সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। এই পদক্ষেপ রিজার্ভের ক্ষরণ বন্ধে কার্যকর প্রমাণিত হয়। এ পরিস্থিতি বর্তমান বিএনপি সরকারের জন্য একটি সুস্পষ্ট ব্লু-প্রিন্ট প্রদান করে: দেশীয় মুদ্রাকে বাজারের ধাক্কা সামলাতে দিতে হবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার ব্যবহার করতে হবে।
সেখানে শুধু মুদ্রানীতি নয়, আর্থিক খাতেও ব্যয় সংকোচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মুদ্রানীতি এবং আর্থিক নীতির সমন্বয় না থাকলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়, যা শেখ হাসিনার সময়ে দেখা গিয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় পূর্ববর্তী সরকার সুদের হার বাড়ায়নি, আর আর্থিক খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও ছিল না। ফলস্বরূপ মূল্যস্ফীতি এক যুগে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তা ৭ শতাংশে কমাতে সক্ষম হন। এই সফলতা অর্থনীতির কোনো জটিল উদ্ভাবন বা বিশেষ কৌশলে নয়, বরং মৌলিক নীতি মানা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পেশাদারি মনোভাবের মাধ্যমে অর্জিত।
সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের জন্য মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবেলা কতটা সফল হবে, তা অনেকাংশে ‘ইম্পসিবল ট্রিনিটি’ মেনে চলার উপর নির্ভর করছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের উদ্বেগ অমূলক নয়। সাধারণত শীর্ষ পদে থাকেন অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ বা ব্যাংকার। সেখানে একজন পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়বাহী ব্যক্তির নিয়োগ আস্থা ও স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন তোলে।
বিশেষত আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে ব্যবসায়ীরা সুদের হার কমানো বা রফতানি প্রণোদনার জন্য চাপ দিলে, নিজে ব্যবসায়ী হিসেবে নবনিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নর নিরপেক্ষ থাকবেন কি না তা বড় প্রশ্ন। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্বাধীন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এতে কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের চাপ গভর্নরের একার ওপর পড়া কমে যাবে এবং অর্থনীতির মূল নীতিপথ থেকে বিচ্যুতি হওয়ার সম্ভাবনা কমবে।
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের ফলে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী, এবং ইতিমধ্যেই দাম বাড়তে শুরু করেছে। তার ওপর এখন ঈদের বাজার চলছে। অতীতে দেখা গেছে, দাম বাড়লে সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্র ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ ওঠে। সত্য, কিছু অসৎ ব্যবসায়ী সবসময় থাকে, কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ না করে ব্যবসায়ীদের ঢালাও দোষারোপ বা জেল-জরিমানা দেওয়া বাজার অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এর ফলে অতীতে দাম কমেনি, বরং বেড়েছে।
বর্তমান সরকারকে তাই দ্রব্যমূল্যের ক্ষেত্রে ‘সিন্ডিকেট’ খোঁজার ভ্রান্ত জনতুষ্টিবাদী পথে না হেঁটে বাজারকে তার গতিতে চলতে দিতে হবে। তবে সংকটের সময়ে, বিশেষ করে সরবরাহ কমলে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জরিমানা না দিয়ে, সরাসরি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। দাম কমাতে চাইলে পণ্যের আমদানি বাড়ানো বা উৎপাদন বৃদ্ধি করে সরবরাহ বাড়ানোই একমাত্র কার্যকর উপায়। কোনো শর্টকাট বা পুলিশি পদক্ষেপে সমস্যা সমাধান হয় না; বরং ক্ষতি বাড়ে।
অতএব, সামনে অর্থনীতির জন্য কঠিন সময় আসছে। এই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং রাজনৈতিক সরকারের মধ্যে সমন্বয় ও অর্থনীতির মূল বিষয়গুলো বোঝাপড়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে দরকার দক্ষ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব, যিনি অর্থনীতির জাহাজটিকে অতীতের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে রক্ষা করে নিরাপদে তীরে নিয়ে আসবেন। শেষ পর্যন্ত, এ ধরনের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

