অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া বড় কিছু উন্নয়ন প্রকল্প পুনর্বিবেচনার মুখে পড়েছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নে এসব প্রকল্পের একটি অংশ বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। ইতোমধ্যে ব্যয় বেশি কিন্তু প্রয়োজন তুলনামূলক কম এমন প্রকল্প শনাক্তে কাজ শুরু করেছে পরিকল্পনা কমিশন। সাধারণভাবে এক হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পকে বড় প্রকল্প হিসেবে ধরা হয়।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রায় ১৮ মাস পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এই সময়ের মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) কার্যক্রম বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৯টি বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ১৩৫টি নতুন প্রকল্প। পাশাপাশি সংশোধনের মাধ্যমে ৬৫টি প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। নতুন প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগই সরকারি নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে, বিদেশি ঋণের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বড় প্রকল্প তুলনামূলক কম নেওয়া হয়েছে এবং বিতর্কিত প্রকল্পও নেই। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কিছু প্রকল্প স্থগিত রাখা এবং কিছু প্রকল্প ধীরে এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। কোন প্রকল্প এ তালিকায় পড়বে তা যাচাই-বাছাই চলছে। একই ধরনের নির্দেশনা অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ একনেক বৈঠকে পুরোনো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ২৫ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা। এতে প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। চট্টগ্রামের বে-টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এছাড়া মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ৬ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা।
নতুন বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। এই প্রকল্পে কোনো বিদেশি ঋণ নেই। মোট ব্যয়ের মধ্যে ২১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা সরকার ঋণ হিসেবে দেবে এবং বাকি ১৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা বহন করবে বাস্তবায়নকারী সংস্থা ইআরএল। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়নের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। প্রকল্পটি গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর অনুমোদন পায়।
এ বিষয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যেসব বড় প্রকল্পের কাজ এখনো শুরু হয়নি, সেগুলো আপাতত স্থগিত রাখা যেতে পারে। তবে যেসব প্রকল্প শেষ পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলো দ্রুত শেষ করা উচিত, যাতে বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যায়।
এই সময়ে একনেকের ১৯টি বৈঠকে ৮৭টি চলমান প্রকল্প সংশোধন করা হয়। এর মধ্যে ৬৫টির ব্যয় বাড়লেও সাতটি প্রকল্পে ব্যয় কমানোর নজির তৈরি হয়েছে। মেট্রোরেল প্রকল্পে একাই ৭৫৪ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। বাকি ছয় প্রকল্পে মোট সাশ্রয় হয়েছে ৯৫০ কোটি টাকা। এছাড়া ১৫টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলেও নির্মাণ ব্যয় বাড়ানো হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনুমোদিত অন্যান্য বড় প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে তিনটি অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্প, যেখানে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ১৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯০৯ কোটি টাকা সরকার এবং ২২৭ কোটি টাকা দেবে বাপেক্স। একইভাবে চারটি কূপ মূল্যায়ন ও অনুসন্ধান প্রকল্পে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যার একটি অংশ বহন করবে বাপেক্স এবং বাকি দেবে সরকার।
এছাড়া নেসকো এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেল সংরক্ষণ প্রকল্পেও ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা, যেখানে কোনো বিদেশি ঋণ নেই। এ ধরনের আরও বেশ কিছু বড় প্রকল্প অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনুমোদন পেয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকল্প বাছাইয়ে সতর্কতা বাড়ানো হচ্ছে। সীমিত সম্পদের মধ্যে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে সরকার ব্যয়-সাশ্রয়ী ও প্রয়োজনভিত্তিক উন্নয়ন কৌশলের দিকে ঝুঁকছে।

