বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। শুধু পরিমাণই নয়, ঋণ পরিশোধের দায়ও দিন দিন ভারী হয়ে উঠছে। গত এক দশকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ প্রায় চারগুণ বেড়েছে। এখন এই চাপ কেবল হিসাবের খাতাতেই সীমাবদ্ধ নেই; সরাসরি প্রভাব ফেলছে বাজেট এবং দেশের অর্থনীতির ভারসাম্যের ওপর।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্যে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের মাত্র ১৮ মাসের মেয়াদে দেশ বৈদেশিক ঋণ ও সুদ মিলিয়ে ৬৭৭ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে। দেশীয় মুদ্রায় এর অঙ্ক ৮২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ ১১ মাসে ৩৭৮ কোটি ডলার এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি ৭ মাসে ২৬৭ কোটি ৬৮ লাখ ডলার শোধ হয়েছে। এত অল্প সময়ে এত বড় পরিশোধের নজির সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল।
সূত্র বলছে, এই পরিশোধের বড় অংশই পুরোনো ঋণের দায় মেটাতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া বড় প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন একই সঙ্গে আসল টাকা এবং সুদ দিতে হচ্ছে। এতে প্রতি বছর ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। সরকার চাইলেও কিস্তি স্থগিত করা সম্ভব নয়, কারণ সময়মতো তা পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। ফলস্বরূপ, বাজেটের বড় অংশ এখন ঋণ পরিশোধে চলে যাচ্ছে।
ঋণের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, ধাপে ধাপে এই চাপ তৈরি হয়েছে। এক দশক আগে বছরে যেখানে ১০০–২০০ কোটি ডলার পরিশোধ করা হতো, এখন তা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে পরিশোধ ছিল ১১০ কোটি ডলার, যা ২০২১-২২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২০১ কোটি ডলারে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পরিশোধ প্রায় ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৩৭ কোটি ডলার, এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়—এক বছরে সর্বোচ্চ। এই ধারাবাহিক বৃদ্ধিই দেখায়, ঋণের চাপ কত দ্রুত ভারী হচ্ছে।
ঋণের এই বৃদ্ধির পেছনে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ভূমিকা বড়। বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানবন্দর, মেট্রোরেল, টানেল—এসব প্রকল্পে বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছিল। তখন গ্রেস পিরিয়ড থাকায় কিস্তির চাপ ছিল না। এখন একসঙ্গে বহু প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হওয়ায় চাপ দ্রুত বেড়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে এই চাপ আরও বাড়বে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, অতীতে নেওয়া অনেক প্রকল্পের ব্যয় ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এখন সেই ঋণ সুদসহ পরিশোধ করতে হচ্ছে, ফলে চাপ আরও বাড়ছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দিতে হলে এখন থেকেই আয় বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ শক্তিশালী না হলে এই চাপ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। পাশাপাশি হুন্ডি ও অর্থ পাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।
সরকারের ভেতর থেকেও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, ঋণ দিয়ে ঋণ শোধের প্রবণতা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাজেটের ভারসাম্য রাখা। উন্নয়ন ব্যয় কমালে অর্থনীতির গতি শিথিল হবে, আর সামাজিক খাতে ব্যয় কমানোও সম্ভব নয়। একই সময়ে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। ফলে বাজেট পরিচালনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে চিত্রটি স্পষ্ট: ঋণের পরিমাণই শুধু বাড়ছে না, পরিশোধের চাপও ত্বরান্বিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক ৮২ হাজার কোটি টাকার পরিশোধ তারই দৃশ্যমান প্রতিফলন। সামনের দিনগুলোতে এই চাপ সামলানোই দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

