নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের কড়িকান্দি ফেরিঘাটের মধ্যবর্তী মেঘনা নদীর ওপর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেতু নির্মাণ প্রকল্পে জটিলতা দেখা দিয়েছে। প্রায় ৯ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) ভিত্তিতে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগকারী এখনো পাওয়া যায়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জোট (কনসোর্টিয়াম) প্রকল্পটি কার্যত ত্যাগ করেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রকল্পটি ২০২০ সালের ১৯ আগস্ট যাত্রা শুরু করে, যখন অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেয়। ১২ নভেম্বর একই বছরের বাংলাদেশ-দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ প্ল্যাটফর্ম সভায় সিদ্ধান্ত হয়, প্রকল্পটি ‘জি-টু-জি’ (সরকার-টু-সরকার) অংশীদারিত্বে বাস্তবায়িত হবে। কোরিয়ার তিনটি কোম্পানি দায়েউ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন, হুন্দাই ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন, এবং কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করে। লেনদেন উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হয় ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি), যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অধীনে কাজ করে।
বিবিএ পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. ভিখারুদ্দৌলা চৌধুরী এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবুল হোসেন জানান, ২০২৪ সালের মার্চে বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রস্তাব আহ্বান করা হলেও তা পরবর্তী বছর মে মাস পর্যন্ত জমা পড়েনি। এর মধ্যে হুন্দাই নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে। দায়েউ-এর প্রতিনিধিরা অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক সড়ক উপদেষ্টার সঙ্গে আলাপচারিতায় জানান, নির্ধারিত উপযোগিতা ঘাটতি তহবিল (ভিজিএফ) পর্যাপ্ত নয়। পরবর্তীতে ‘সমন্বয়যোগ্য উপযোগিতা ঘাটতি তহবিল’ প্রস্তাব দেওয়া হলেও বিনিয়োগকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তারা ‘ন্যূনতম যান চলাচল নিশ্চয়তা’ পদ্ধতির বদলে ‘প্রাপ্যতাভিত্তিক অর্থ প্রদান’ বা ‘ন্যূনতম রাজস্ব নিশ্চয়তা’ পদ্ধতির দাবি করেন, যা প্রকল্পের মূল শর্তের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ।
প্রকল্পের বিনিয়োগ ও নকশা
পুরো প্রকল্পে বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ৮৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৯ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা)। সরকারের পক্ষ থেকে ‘ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং’ হিসেবে ১৫৩ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা) অনুমোদিত হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের ১৮.১৮ শতাংশ।
নকশা অনুযায়ী, মেঘনা নদীর ওপর ৩.৩১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘এক্সট্রাডোজড কনক্রিট বক্স গার্ডার’ প্রযুক্তির সেতু নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ১.৬৩ কিলোমিটার এবং ভায়াডাক্টের দৈর্ঘ্য ১.৬৮ কিলোমিটার। এছাড়া ৪.২০৪ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও ২.৫ কিলোমিটার নদী শাসন কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনের জন্য সরকারের আলাদা প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। প্রকল্প এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ২২৫.৫৯৮ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবুল হোসেন জানান, বর্তমান সংকট সমাধানের জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করার প্রস্তুতি চলছে। এক ধাপের দরপত্র প্রক্রিয়া বা ‘সিঙ্গেল স্টেজ বিডিং প্রসেস’ অনুসরণ করে নতুন প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে। প্রকল্পের মোট সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৪ বছর। এর মধ্যে ৪ বছর নির্মাণকাল এবং পরবর্তী ৩০ বছর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর থাকবে।

