মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এতে প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা এখন কেবল সামরিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জটিলতা তৈরি হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়ছে।
এডিবির মতে, এই পরিস্থিতির কারণে জ্বালানির দাম বাড়ছে, সরবরাহ–শৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের আর্থিক বাজারে চাপ বাড়ছে। পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে সংঘাতের স্থায়িত্ব অনুযায়ী সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে, অর্থাৎ জুন পর্যন্ত পরিস্থিতি চললে, প্রতি ব্যারেল তেলের গড় দাম প্রায় ১০৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে। আর যদি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে তেলের দাম ১৩০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। এই সময় গ্যাসের দামও বাড়বে।
অন্যদিকে, সংঘাত যদি এক বছরের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তেলের দাম ১৫৫ ডলারের বেশি হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি ২০২৬-২৭ সময়ে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত কমতে পারে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত।
এডিবি বলছে, এই প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করবে সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ তুলনামূলক বেশি বাড়তে পারে।
এডিবির প্রধান অর্থনীতিবিদ আলবার্ট পার্কের মতে, জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘ সময় বিঘ্নিত হলে তা উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই সরকারগুলোর উচিত বাজারের অস্থিরতা কমানো, ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতিমূলক নীতি গ্রহণ করা।
সংস্থাটি চারটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—জ্বালানির দাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ না করে আংশিকভাবে বাজারভিত্তিক রাখা, যাতে সাশ্রয় বাড়ে এবং বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত সময়ের জন্য দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত খাতে আর্থিক সহায়তা দেওয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নজর রাখা, তবে অতিরিক্ত কঠোর নীতি না নেওয়া।
একই সঙ্গে জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। যেমন—এসি ব্যবহারে তাপমাত্রা নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো, বাসা থেকে কাজ বা সময় ভাগ করে অফিস পরিচালনা। পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া এবং শহরে নির্দিষ্ট দিনে গাড়িমুক্ত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা দিতেও এগিয়ে এসেছে এডিবি। সংস্থাটি জানিয়েছে, দ্রুত বিতরণযোগ্য বিশেষ ঋণ ও সহায়তা প্যাকেজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ানো যাবে। সহজ শর্তে এই সহায়তা দেওয়া হবে।
এই সহায়তার আওতায় একদিকে সরকারগুলো বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে সহায়তা পাবে, অন্যদিকে বাণিজ্য ও সরবরাহ অর্থায়নের মাধ্যমে জ্বালানি, খাদ্যসহ জরুরি পণ্য আমদানি সচল রাখা যাবে। বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় তেল আমদানির জন্য সীমিত সময়ের সহায়তাও পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

