মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দেওয়ায় বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে জরুরি চাহিদা মেটাতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৩ লাখ টন ডিজেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
সরকার এখন কাজাখস্তান ও নাইজেরিয়ার সঙ্গে সরকার-থেকে-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছে। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি—দুই ধরনের চুক্তির লক্ষ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। ফলে ‘ফোর্স মাজ্যুর’ ঘোষণা এবং চালান বিলম্বের ঘটনা ঘটছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
মার্চে নির্ধারিত ১ লাখ ২৫ হাজার টন ডিজেলের পাঁচটি কার্গো এবং ২৫ হাজার টন জেট ফুয়েলের চালান অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়েছে। বিপিসির দুই দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী—ইউনিপেক সিঙ্গাপুর ও পেটকো ট্রেডিং—সরবরাহ স্থগিত করায় সংকট আরও গভীর হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ১৯ মার্চ নাইজেরিয়া এবং ২৪ মার্চ কাজাখস্তান বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এতে দুই দেশের সঙ্গে যোগাযোগে কূটনৈতিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
কাজাখস্তানকে সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে দেখছে সরকার। দেশটির বড় হাইড্রোকার্বন মজুদ, স্থিতিশীল উৎপাদন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে সুবিধা দিতে পারে। এলপিজি আমদানির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে আফ্রিকার বৃহত্তম তেল উৎপাদক নাইজেরিয়ার সঙ্গেও যোগাযোগ জোরদার করা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত এনএনপিসির সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রয়োজন নির্ধারণ করে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
সংকট মোকাবিলায় সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ৩ লাখ টন ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড থেকে ১ লাখ টন এবং সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল (গ্রুপ) লিমিটেড থেকে ২ লাখ টন ডিজেল আনা হবে।
তবে এর আগে অনুমোদিত আরেক চুক্তিতে পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল (দুবাই) ও এঅ্যান্ডএ অয়েল অ্যান্ড গ্যাস (যুক্তরাষ্ট্র)-এর সরবরাহ প্রক্রিয়া এখনো আটকে আছে। পারফরম্যান্স গ্যারান্টি জমা না দেওয়ায় অগ্রগতি থমকে রয়েছে। এতে এপ্রিলের সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে প্রতি মাসে ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টন ডিজেল প্রয়োজন হয়। পরিবহন, কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই জ্বালানির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কর্মকর্তারা জানান, ২৫ হাজার টনের একটি কার্গো প্রায় ১০ দিনের চাহিদা মেটাতে পারে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে অল্প সময়ের জন্য জ্বালানি রেশনিং চালু করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে কিন্তু সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এখনো অনিশ্চিত।
বর্তমান সংকট দেখিয়েছে, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সরকার এখন উৎস বৈচিত্র্যকরণের ওপর জোর দিচ্ছে।
কাজাখস্তান ও নাইজেরিয়ার সঙ্গে নতুন যোগাযোগ শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

