চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বড় ধাক্কা এসেছে বৈদেশিক ঋণপ্রবাহে। এই সময়ে বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহযোগী পাঁচটি বড় দেশ যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, রাশিয়া, চীন ও ভারত কোনো নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।
তবে পুরো চিত্র একেবারে নেতিবাচক নয়। বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কিছুটা ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো সংস্থাগুলো আগের প্রতিশ্রুত অর্থ ছাড় অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাকি দেশগুলোও পূর্ব প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থ ছাড় করেছে, যদিও নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি না পাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক ড. এনামুল হকের মতে, দেশে নতুন সরকার গঠন এবং আসন্ন বাজেট প্রণয়নকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন সহযোগীরা অপেক্ষার অবস্থানে থাকতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে এবং নতুন ঋণ সহায়তায় গতি আসতে পারে।
এদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতা, বিশেষ করে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানির চাপ বেড়েছে। ফলে সামনে বড় অঙ্কের ঋণের প্রয়োজন হতে পারে সরকারের।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আইডিএ থেকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে ২৭ কোটি ডলারের কিছু কম। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৫ কোটি ডলার। যদিও এই সময়ে সংস্থাটি ৫৬ কোটি ডলার ছাড় করেছে, যা নতুন প্রতিশ্রুতির তুলনায় অনেক বেশি।
অন্যদিকে এডিবির ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। সংস্থাটি এই সাত মাসে ১২৭ কোটি ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। একই সময়ে এডিবি প্রায় ৫৪ কোটি ডলার ছাড় করেছে। অর্থাৎ নতুন প্রতিশ্রুতি ছাড়ের তুলনায় অনেক বেশি।
এ ছাড়া অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার ক্ষেত্রেও নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি কমেছে। জাতিসংঘের কাছ থেকে এ সময়ে মাত্র ২ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি মিলেছে, যা আগের বছরের তুলনায় কম। এদিকে এশীয় পরিকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) কোনো নতুন প্রতিশ্রুতি দেয়নি এবং তাদের অর্থছাড়ও খুব সীমিত ছিল।
দ্বিপক্ষীয় সহযোগীদের মধ্যে জাপান নতুন কোনো ঋণ দেয়নি, তবে ১৮ কোটি ডলারের বেশি ছাড় করেছে। রাশিয়া প্রায় ৫৮ কোটি ডলার, চীন ২২ কোটি ডলার এবং ভারত প্রায় ১২ কোটি ডলার ছাড় করেছে—কিন্তু নতুন প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান যৌথভাবে ৪৫ কোটি ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছরের একই সময়ে এই দুই দেশ থেকে কোনো নতুন প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট ২২৭ কোটি ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ২৩৫ কোটি ডলার।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে মোট বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বেশি।

