অর্থবছরের শেষ চার মাসে সরকারের উপর চাপ বাড়ছে। প্রতি মাসে গড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় না হলে বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের কোনো মাসেই এই লক্ষ্য ছাড়ানো সম্ভব হয়নি; সর্বাধিক আদায় হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকার কম।
রাজস্ব সংগ্রহে ধীরগতি মূলত অর্থনীতির স্বাভাবিক গতির কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের কারণে। কঠোর মুদ্রানীতি, উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা, আমদানি হ্রাস এবং মূল্যস্ফীতি সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আয়ের ওপর।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায়। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অর্থবছরের শেষে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
লক্ষ্যের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক এখন প্রধান উদ্বেগ। জুলাই-ফেব্রুয়ারিতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। বাস্তবে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সংস্থা লক্ষ্যের তুলনায় ২২ শতাংশ পিছিয়ে আছে। তবে আদায়ের অংশ থেকেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ।
রাজস্বের প্রধান তিনটি খাত আয়কর, আমদানি শুল্ক এবং ভ্যাট কোনোটিই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় ঘাটতি আয়কর খাতে, ৩৩ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। আমদানি শুল্কে ঘাটতি ১৭ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। ভ্যাটের ক্ষেত্রে লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ২১৪ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৯৭ হাজার ২৮২ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এটি সাময়িক সমস্যা নয়, বরং কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “অর্থনীতির ধীরগতি ও বিনিয়োগের কমে যাওয়া রাজস্ব আদায়কে বাধাগ্রস্ত করছে। এনবিআরের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও করজাল সম্প্রসারণে অগ্রগতি রোধ করছে।”
ড. জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়, বলেন, “কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে কম। করদাতার সংখ্যা বাড়ানো এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে ঘাটতি কাটানো কঠিন।”
সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ উল্লেখ করেন, “কর কাঠামো এখনও মূলত পরোক্ষ করনির্ভর। আয়কর ভিত্তি বৃদ্ধি না করলে টেকসই রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব নয়।”
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অস্থিরতা, জাতীয় নির্বাচন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকট—সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ধীর হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক চাপও আছে। আইএমএফের ঋণ শর্ত অনুযায়ী, প্রতিবছর জিডিপির অন্তত ০.৫ শতাংশ অতিরিক্ত রাজস্ব বৃদ্ধি করতে হবে। তবে কাঠামোগত সংস্কার এখনো সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি।
রাজস্ব বাড়ানো এবং জনস্বার্থ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখা সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনবিআরের পুনর্গঠন ও নীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ থাকলেও অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতায় এগোচ্ছে ধীরগতিতে।

