গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আগুন লেগেছে। তবে এর অভিঘাত এখন শুধু ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই।
বৈশ্বিক অর্থনীতির নানা স্তরে ধাক্কা পড়ছে। আমদানি, রেমিট্যান্স ও রফতানি যেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল সেগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন যে, এই ধরনের বৈশ্বিক ঝুঁকি বাংলাদেশকে সরাসরি আঘাত করতে পারে। আর সেই পূর্বাভাস এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
জ্বালানি খাত: আঘাতের প্রথম রেখা
বাংলাদেশ তার জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আসে। কিন্তু ২১ মাইল প্রশস্ত এই জলপথ এখন কার্যত স্থবির। এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ২১–২৮ ডলার হয়ে গেছে। ডিজেলের দামও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি।
এর ফলে জ্বালানি খাতে বছরে প্রায় ৬–৭ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। শুধু জ্বালানিই নয়, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়ছে, যা খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
সরকার ইতোমধ্যেই জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে জ্বালানি ব্যবহার সীমিত করা, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা, তেল ডিপোতে সেনা মোতায়েন এবং বিকল্প উৎস থেকে ডিজেল আমদানি। তবে এ সব ব্যবস্থা এখনো স্থিতিশীল অর্থনীতির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।
রফতানি খাত: তৈরি পোশাকের সংকট
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি দেয় এবং প্রায় ৪০ লাখ কর্মসংস্থান যোগায়, যার বড় অংশই নারী শ্রমিক। কিন্তু সংঘাতের কারণে পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। ঢাকা থেকে ছয়টি এয়ারলাইনস কার্গো ফ্লাইট স্থগিত হয়েছে, সমুদ্রপথে জাহাজ কেপ অব গুড হোপ হয়ে ঘুরছে। এর ফলে কাঁচামাল আমদানি ও রফতানি ব্যাহত হচ্ছে, পরিবহন খরচ ও বীমা প্রিমিয়াম বেড়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিবহন খরচ ২৫ শতাংশ বেড়ে এবং রফতানি চাহিদা ৫ শতাংশ কমলে জিডিপি ১.৪ শতাংশ কমতে পারে। যেখানে কারখানার লাভ মাত্র ৩–৫ শতাংশ, সেখানে এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন তোলে।
রেমিট্যান্স: মানবিক প্রভাব
বাংলাদেশের ৮ মিলিয়নের বেশি শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করছেন। তারা প্রতি মাসে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠান। মোট রেমিট্যান্সের ৪৫ শতাংশ আসে এই অঞ্চল থেকে।
যুদ্ধের কারণে শ্রমিকদের চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। যদি মাসিক রেমিট্যান্স ৩ বিলিয়ন থেকে ২.৫ বিলিয়নে নেমে আসে, তবে বছরে ৫–৬ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি দেখা দেবে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি ও পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা প্রভাবিত হবে।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, রফতানি ব্যাঘাত ও রেমিট্যান্স হ্রাস এই তিনটি ধাক্কা মিলিয়ে দুই বছরের মধ্যে জিডিপি প্রায় ৩ শতাংশ কমতে পারে। বাস্তব আয় কমবে, দারিদ্র্য বাড়বে এবং অর্জিত উন্নয়ন পিছিয়ে যাবে।
করণীয়:
- জ্বালানি সরবরাহে বৈচিত্র্য আনতে হবে, ভারত ও চীনের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
- রফতানি খাতে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি ও ক্রেতাদের সঙ্গে সময়সীমা সমন্বয় জরুরি।
- প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং শ্রমবাজার বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে—পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপে।
বাংলাদেশ এ যুদ্ধ শুরু করেনি, কিন্তু এর প্রভাব মোকাবেলায় পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। যদি কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ নিলে না নেয়া হয়, তবে এ সংকটের মূল্য আরও বড় হবে।
লেখক: মোহাম্মদ কবির হাসান: মফেট চেয়ার অধ্যাপক, ফাইন্যান্স; লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটি, নিউ অরলিন্স, যুক্তরাষ্ট্র

