সোমালিয়ায় যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু সেখানেই সীমাবদ্ধ নেই। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে জানিয়েছে, চলমান সংকটের কারণে আগামী জুনের মধ্যে আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ চরম খাদ্য অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে পারেন। এর আগে থেকেই বিশ্বে প্রায় ৩১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে ছিল।
উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহে ভয়াবহ অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সংকট ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ের চেয়ে আরও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
সার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, জ্বালানি সরবরাহে বাধা ও নৌপথ সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত কৃষি খাতের কার্যক্রম বিপর্যস্ত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সংকটের মূল কারণ হলো উপসাগরীয় দেশগুলোর সারের একক আধিপত্য। যুদ্ধের শুরু থেকে অঞ্চলে সার উৎপাদন প্রায় বন্ধ। হরমুজ প্রণালীসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে পণ্য পরিবহন সীমিত হওয়ায় ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া ও সালফারের মতো কৃষি উপকরণের আন্তর্জাতিক মূল্য হু হু করে বাড়ছে।
ভারতের পাঞ্জাব, যা দেশটির শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত, সেখানে ধান চাষের মৌসুম শুরুর আগেই কৃষকরা সার সংকটে আতঙ্কিত। সরকারি সরবরাহ কমে যাওয়া ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট তাদের জমি তৈরিতে হিমশিম খেতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতিও তেমন, যেখানে গ্যাস সংকটের কারণে পাঁচটি সরকারি সার কারখানার মধ্যে চারটি বিভিন্ন সময়ে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও কৃষকরা সারের চড়া দামের কারণে উৎপাদনে বাধার মুখে পড়েছেন। মিনেসোটা ও অন্যান্য অঞ্চলের কৃষকরা জানিয়েছেন, ভুট্টা রোপণের মৌসুমে সারের দাম এত বেশি বেড়ে গেছে যে তারা নগদ অর্থ বা ঋণ জোগাড় করতে পারছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২২ সালের সংকট প্রধানত রফতানি বন্ধের কারণে খাদ্যশস্য সরবরাহে বাধা তৈরি করেছিল। এবার পরিস্থিতি সরাসরি খাদ্য উৎপাদনের সব স্তরে আঘাত হানছে। আধুনিক কৃষি প্রায় সম্পূর্ণরূপে নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের ওপর নির্ভরশীল, যা প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তৈরি হয়। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিও খাদ্য পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের ব্যয় বাড়াচ্ছে।
ডব্লিউএফপি সতর্ক করেছে, বিশ্বে দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোতে এটি এখন অস্তিত্বের সংকটের মতো। সোমালিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আগামী জুনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বর্ষা মৌসুমের চাষাবাদ শুরু হবে। বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে এ সময় সারের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। কৃষকরা যদি প্রয়োজনীয় সার না পান, বিদেশ থেকে চড়া দামে খাদ্য আমদানির বাধ্যতা সৃষ্টি হবে, যা দেশগুলোর অর্থনীতিতে আরও চাপ তৈরি করবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সারকে জ্বালানির মতো কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। জরুরি মজুত এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা না হলে, এই যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের রূপ নেবে।

