বাংলাদেশের সামনে তৈরি হয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১.৬ বিলিয়ন ডলার (১৬০ কোটি) ঋণ পাওয়ার সুযোগ। নতুন ও চলমান বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় এই অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়ে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে সরকার তৎপর। ঠিক এই সময়েই এডিবির ঋণের বিষয়টি সামনে এসেছে।
মোট ঋণের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার বিশেষ প্যাকেজের আওতায় পাওয়া যেতে পারে। বাকি ৬০০ মিলিয়ন ডলার ‘ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্নেন্স’ কর্মসূচির আওতায় বাজেট সহায়তা হিসেবে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এডিবি ২৩ মার্চ ঘোষণা করেছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলো যেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপ সামলে উঠতে পারে, তার জন্য এই বিশেষ প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ না করে) জানান, ঘোষণার পর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ঋণপ্রাপ্তির বিষয়ে এডিবির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে। তবে অর্থ পেতে হলে সরকারকে একটি ‘নিডস অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট’ জমা দিতে হবে। এতে জাতীয় বাজেটের উপর যুদ্ধের প্রভাব এবং অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে। প্রতিবেদনের পরই এডিবি ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু করবে।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ২-৩ মাসের মধ্যে বাংলাদেশ এই অর্থ পেতে পারে। ঋণের সুদের হার হবে সিকিউর্ড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট প্লাস ০.৭৫ শতাংশ, তিন বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরে পরিশোধ করতে হবে।
বিশেষ প্যাকেজের দুইটি অংশ
১. দ্রুত বিতরণযোগ্য বাজেট সহায়তা – অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করবে।
২. ট্রেড অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স প্রোগ্রাম – জ্বালানি, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানে বেসরকারি খাতকে সহায়তা দেবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এডিবির এই প্যাকেজ ঘোষণার আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পনা তৈরি করছে এবং মূল্যায়নের ভিত্তিতে সরকার এডিবিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছে সহায়তা চাইবে।
যুদ্ধ ইতোমধ্যে দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। গত তিন সপ্তাহে সরকার চড়া দামে নয়টি এলএনজি কার্গো অর্ডার করেছে। ‘জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্স’ অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে ২০২৫ সালের তুলনায় বার্ষিক জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি বিল ৪০ শতাংশ বা ৪.৮ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যেতে পারে।
এডিবির বিশ্লেষণ বলছে, যুদ্ধের কারণে শিপিং রুট বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পণ্য পরিবহন খরচ ও সময় দুটোই বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পেট্রোকেমিক্যাল, সার, কৃষি এবং খাদ্য উৎপাদনে পড়তে পারে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স ও পর্যটননির্ভর দেশগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
‘ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্নেন্স’ কর্মসূচির দ্বিতীয় কিস্তি হিসেবে আগামী জুনের মধ্যে ৬০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পেতে পারে। এটি সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ কমাবে এবং অর্থায়নের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করবে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ডিসেম্বর মাসে এডিবি প্রথম কিস্তি ৬০ কোটি ডলার ছাড় করেছিল। চলতি মাসের শুরুতে এডিবির প্রতিনিধি দল ঢাকায় সফর করে। কর্মকর্তারা জানান, ১৭টি শর্তের অধিকাংশ পূরণ হয়েছে, বাকিগুলো আগামী দুই মাসে শেষ হবে। শর্তগুলো মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও এনবিআরের রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে।
একই কর্মসূচির আওতায় জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা) ও ওপেক ফান্ড থেকেও আরও ৩০০ মিলিয়ন ডলার সহ-অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ নিয়ে এডিবির সঙ্গে আলোচনা চলছে।

