বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। এ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হলো তুলা। তবে দেশের তুলা চাহিদার প্রায় পুরো অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ চীনকে টপকে তুলা আমদানিতে শীর্ষে ওঠার কৃতিত্বও দেখিয়েছে। বর্তমানে মোট চাহিদার প্রায় ৯৭ শতাংশই আমদানি নির্ভর।
দেশজুড়ে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হচ্ছে। এখানে উৎপাদন হয় দুই লাখ বেল, যেখানে প্রতিটি বেলের ওজন ১৮২ কেজি। তুলনামূলকভাবে, গত বছর ৪৫,১৫০ হেক্টর জমিতে দুই লাখ ১০ হাজার বেল তুলা উৎপাদিত হয়েছিল।
রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে দেশে তুলার চাহিদাও দ্রুত বেড়েছে। তবু দেশীয় উৎপাদন মাত্র ৩–৪ শতাংশ চাহিদা মেটাতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এত চাহিদার মধ্যে সরকারের উদ্যোগ তেমন কার্যকর হয়নি। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উৎপাদন বৃদ্ধির ও নতুন জাত উদ্ভাবনের গবেষণা সীমিত। সরকারি সহযোগিতা ও বরাদ্দে অবহেলার কারণে চাহিদার ন্যূনতম তুলাও উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। অথচ দেশি উৎপাদন বাড়ালে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যেত।
তুলা উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জমির স্বল্পতার কারণে বাংলাদেশে তুলা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কখনো সম্ভব হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে চাহিদার অর্ধেক উৎপাদন করাও অসম্ভব। বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, জোর প্রচেষ্টা চালালে দেশের চাহিদার সর্বোচ্চ ১০–১৫ শতাংশ তুলা উৎপাদন করা সম্ভব।
তুলা আমদানিতে বাংলাদেশ বছরে খরচ করছে ৪–৫ বিলিয়ন ডলার। কৃষিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল ইকোনমিকস (বিএই) গত বছর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, প্রতি বছর তুলা আমদানি ও ব্যয় উল্লেখযোগ্য।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৮৩ লাখ বেল তুলা আমদানি করা হয়েছিল, যার ব্যয় হয়েছিল ৩৯২ কোটি ডলার। ২০২০ সাল থেকে পাঁচ বছরের ডেটা অনুযায়ী, ২০২০ সালে ৬৫ লাখ বেল তুলা আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৩২৯ কোটি ডলার। পরের বছর ২০২১-এ ব্যয় হয়েছিল ৪৭২ কোটি, ২০২২-এ ৫০৪ কোটি ও ২০২৩ সালে ৪০২ কোটি ডলার।
জমি স্বল্পতার কারণে সরাসরি তুলা উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব না হলেও, তুলার সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে সবজি, ডাল ও মসলা জাতীয় ফসল চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বরেন্দ্র, লবণাক্ত, চরাভূমি, অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি ও পার্বত্য এলাকায় তুলা চাষ সম্প্রসারণে ইতিবাচক ফল দেখা যাচ্ছে—তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল আমিনের মন্তব্য। এই পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের স্থিতিশীলতা ও বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ে তুলার উৎপাদন ও আমদানির ভারসাম্য জরুরি। উৎপাদন বাড়ানো না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে খরচ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারাদেশে ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অনুযায়ী উৎপাদন হবে ২ লাখ ৫২ হাজার বেল। তুলনায় গত বছর ৪৬,৭৬০ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ১৯ হাজার বেল তুলা উৎপাদন হয়েছিল।
গত কয়েক বছর উৎপাদন প্রায় ২ লাখ থেকে ২ লাখ ২০ হাজার বেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে। বর্তমানে দেশের ৩৯টি জেলা ও ১৩২টি উপজেলায় তুলা চাষ হচ্ছে। ধীরগতিতে হলেও চাষের জমি বাড়ছে। দেশজুড়ে চার ধরনের তুলা চাষ হয়—চরাঞ্চলের জন্য চর কটন, পাহাড়ের জন্য হিল কটন, সমতলের জন্য আপলাইন কটন এবং বরেন্দ্র এলাকার জন্য ড্রাউট কটন।
তুলার চাহিদা ও আমদানি
বাংলাদেশে বার্ষিক তুলার চাহিদা প্রায় ৮৫ লাখ বেল। এর মধ্যে দেশের ৫১৯টি টেক্সটাইল মিলের চাহিদা alone প্রায় ৮০ লাখ বেল। বর্তমান উৎপাদন বিপর্যস্ত অবস্থায় থাকায় প্রায় ৮৩ লাখ বেল তুলা প্রতিবার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বর্তমানে সর্বাধিক তুলা আমদানি হচ্ছে ব্রাজিল থেকে। এর আগে শীর্ষে ছিল ভারত। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকার দেশ বেনিনসহ কয়েকটি দেশ থেকেও তুলা আমদানি করা হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল এলাকার তুলা চাষি মনিরুল ইসলাম জানালেন, ‘সরকার খাদ্য উৎপাদনে যেমন মনোযোগী, তেমনি তুলা উৎপাদনেও মনোযোগ দেওয়া উচিত। বীজ পেতে মাঝে মধ্যে সমস্যা হয়, দামও বেশি।’ তিনি আরও বলেন, ‘উঁচু জমিতে তুলার ফলন থাকলেও সেই জমিতে অন্য শস্য চাষ করা সহজ ও লাভজনক। এজন্য অনেক চাষি এখন তুলা চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন।’
এ পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট, তুলার দেশে উৎপাদন ও আমদানি ভারসাম্য নিশ্চিত করা না গেলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল চাহিদা পুরোপুরি মেটানো কঠিন হবে।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের ভূমিকা
বাংলাদেশে স্বাধীনতা পরবর্তী বস্ত্র শিল্পের বিকাশে দেশীয় টেক্সটাইল মিলে ব্যবহারের জন্য তুলার সরবরাহ বাড়াতে ১৯৭২ সালে তুলা উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হয়। ১৯৯১ সালে তুলা গবেষণার দায়িত্ব বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে বোর্ডের ওপর স্থানান্তরিত হয়। এরপর থেকে দেশের তুলা উৎপাদন বাড়ানো, নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং চাষ সম্প্রসারণের দায়িত্ব এ সংস্থার ওপর।
যদিও দীর্ঘদিন ধরে বোর্ড চেষ্টা চালাচ্ছে, তবু তুলা উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হয়নি। প্রতি বছর সরকার বোর্ডকে গবেষণা, তুলা চাষ সম্প্রসারণ, বীজ উৎপাদন ও বিতরণ, প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও জিনিং কাজে সহায়তার জন্য বরাদ্দ দিচ্ছে। প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে। তবু প্রত্যাশিত উৎপাদন এখনো অধরা।
বোর্ডের লক্ষ্য দেশের চাহিদার ২০ শতাংশ তুলা উৎপাদন করা। তবে জমিস্বল্পতার কারণে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কঠিন। এমনকি চাহিদার অর্ধেক উৎপাদন করাও প্রায় অসম্ভব। বর্তমান বাস্তবতায় জোর প্রচেষ্টা চালালে দেশের চাহিদার সর্বোচ্চ ১০–১৫ শতাংশ তুলা উৎপাদন সম্ভব। তবে বোর্ডের কার্যকারিতা সীমিত এবং সরকারের সহযোগিতা ও গবেষণার অভাবের কারণে এই পরিমাণও অর্জন করা যাচ্ছে না।
বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল আমিন জানান, ‘আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। উচ্চফলনশীল ও স্থানীয় চাষের উপযোগী জাতের মাধ্যমে তুলার উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। গবেষণার মাধ্যমে জলবায়ু উপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবন, মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ, স্বল্প উৎপাদনশীল জমিতে চাষ সম্প্রসারণ এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জমি স্বল্পতার কারণে সীমাবদ্ধতা থাকলেও সাথি ফসল হিসেবে সবজি, ডাল ও মসলা জাতীয় ফসলের চাষ সম্প্রসারণ চলছে। বরেন্দ্র, লবণাক্ত, চরাভূমি, অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি ও পার্বত্য এলাকায় এর সাড়া ভালো।’
তুলা উন্নয়ন বোর্ড এ পর্যন্ত সিবি-১২ থেকে সিবি-১৮, সিডিবি তুলা-১৯ থেকে সিডিবি তুলা-২১ এবং পাহাড়ি তুলা-৩ নামে ২৪টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া সিবি হাইব্রিড-১ নামে একটি উচ্চফলনশীল হাইব্রিডও অবমুক্ত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ২০০৯-১০ মৌসুম থেকে মাঠ পর্যায়ে হাইব্রিড চাষ হচ্ছে। বিঘাপ্রতি গড় ফলন এখন ১২–১৫ মণ।
গবেষণার মাধ্যমে মোট একটি হাইব্রিড, ২৬টি উচ্চফলনশীল জাত এবং ৬০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২১,১০০ জন তুলা চাষির মধ্যে ১৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকার কৃষি প্রণোদনা কার্যক্রমের আওতায় হাইব্রিড তুলা বীজ, সার, কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।
এই তথ্যগুলো স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, উদ্যোগ আছে, গবেষণা চলছে, কিন্তু জমিসংকট ও সীমিত সরকারি সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশের তুলা উৎপাদন এখনও চাহিদার চেয়ে অনেক কম।

