বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার টেকনাফ স্থলবন্দর প্রায় ১০ মাস ধরে অচল। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ধীরে ধীরে কমে আসা বাণিজ্য কার্যক্রম এখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আয়, স্থানীয় বাজার ও শ্রমজীবী মানুষের জীবিকায়।
গত অর্থবছরে এই বন্দর বন্ধ থাকার কারণে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে স্থানীয় বাজারে। কর্মসংস্থান হারিয়ে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক। সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পাঠানো এক চিঠিতে এই সংকটের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছে। সেখানে দ্রুত বন্দর সচল করতে কয়েকটি সুপারিশও করা হয়েছে।
এই বন্দর দিয়ে সীমান্ত বাণিজ্যের আওতায় নিয়মিত চাল, ডাল, ছোলা, মসলা, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, শুকনো মরিচ, মাছ, শুঁটকি ও সিমেন্ট আমদানি হতো। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে প্লাস্টিক পণ্য, চিপস ও কটন ফেব্রিক্স রপ্তানি করা হতো।
কাস্টমসের চিঠিতে বলা হয়, বৈধ পথে পণ্য আমদানি বন্ধ থাকায় বাজারে মিয়ানমারের পণ্যের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং অবৈধ ব্যবসা শক্তিশালী হচ্ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে টেকনাফ স্থলবন্দর থেকে প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮০৪ কোটি টাকা। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ায় রাজস্ব নেমে আসে মাত্র ১৩০ কোটিতে। এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব কমেছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।
বন্দর চালুর জন্য পাঁচ সুপারিশ
চট্টগ্রাম কমিশনারেট এনবিআরকে দেওয়া চিঠিতে বন্দর সচল করতে পাঁচটি মূল প্রস্তাব তুলে ধরেছে। প্রথমত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত বাণিজ্য চালুর সমঝোতা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, কাস্টমস বিধি অনুযায়ী বন্দর কার্যক্রম চালু রাখতে হবে। তৃতীয়ত, আমদানিকৃত পণ্যের আড়ালে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নজরদারি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত টহল জোরদার করতে হবে।
চতুর্থত, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়িয়ে অবৈধ পণ্য পরিবহন কঠোরভাবে দমন করা জরুরি। পঞ্চমত, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করে তাদের ঝুঁকি কমাতে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। পাশাপাশি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য সীমান্ত বাণিজ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বন্দরের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দ্রুত সংস্কার না করলে পুনরায় চালু করা কঠিন হবে। এছাড়া ব্যাংক ড্রাফটের বিপরীতে মিয়ানমারে আটকে থাকা পণ্য দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থাও জরুরি।
টেকনাফ স্থলবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান বলেন, মিয়ানমার থেকে আবার পণ্য আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বন্দর চালু করতে সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে এবং আমদানিকারকরাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এনবিআরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই বন্দরটি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বন্দর চালুর বিষয়ে এনবিআরের আপত্তি নেই। কারণ, আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক হলে রাজস্ব আয় আবারও বাড়বে।

