মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে এশিয়ার অনেক দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকটের প্রতিফলন বাংলাদেশের বাজারেও দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, মূল্য বৃদ্ধির চাপ এবং আমদানিতে নির্ভরতার কারণে দেশে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।
সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করছে। এর অংশ হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ দামে এলএনজি (লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস) ক্রয় করা হচ্ছে। এপ্রিল মাসের জন্য প্রয়োজনীয় নয়টি কার্গো সরবরাহের নিশ্চয়তা দিয়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, “আমরা এপ্রিলের চাহিদা অনুযায়ী নয়টি কার্গো নিশ্চিত করেছি। বিষয়টি গত ২৫ মার্চ নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে আটটি কার্গো কেনা হবে স্পট মার্কেট থেকে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়।”
তবে মার্কিন ক্রেডিট রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা এসেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা সামষ্টিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কিছু চিহ্ন দেখালেও আমদানীকৃত জ্বালানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং দুর্বল বৈদেশিক অবস্থানের কারণে “অধিক ঝুঁকিতে” রয়েছে। প্রতিবেদনে বিশেষ করে উল্লেখ করা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্ন এসব দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে এলএনজি কিনতে বেশি দাম দিতে হলেও সরকার সরবরাহ সংকট মোকাবেলায় এটি জরুরি মনে করছে। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, স্পট মার্কেট থেকে কার্গোপ্রতি এলএনজি প্রতি এমএমবিটিইউ গড়ে প্রায় ২২ ডলারে কেনা হচ্ছে। যুদ্ধের আগে একই পরিমাণ এলএনজি প্রতি এমএমবিটিইউ মাত্র ৯-১০ ডলারে পাওয়া যেত। অর্থাৎ সরবরাহ বজায় রাখতে দ্বিগুণেরও বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
এর ফলে চলতি অর্থবছরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাবে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান বণিক জানিয়েছেন, “এ বছর জ্বালানি খাতে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার মতো ভর্তুকি লাগবে।” জ্বালানি খাতে সরকারের ব্যয় সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকেও আলোচিত হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আইএমএফের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির অতিরিক্ত খরচ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৭০-৮০ শতাংশই আমদানি নির্ভর। অপরিশোধিত তেল আসে মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। আর পরিশোধিত তেল আসে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও চীন থেকে। চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে তেলের দাম বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছেছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ জানিয়েছে, যদি ২০২৬ সালে তেলের দাম ১০০ ডলারের বেশি থাকে, বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার বাড়বে।
মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, “আগে জ্বালানি তেল সাধারণত ১৫ দিনের মজুদ রাখা হতো। এখন তা এক মাসের মতো আছে। আমরা মজুদ আরও বড় করার চেষ্টা করছি।”
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম (অমিত) জানান, সরকার প্রতিদিন জ্বালানি তেলে ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। তবে মাঠে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফিলিং স্টেশনের বাইরে দীর্ঘ যানবাহনের সারি, কয়েক ঘণ্টা ধরে লাইনে থাকার পরও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু পাম্পে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। আবার মজুদদারি ও বিক্রির সীমাবদ্ধতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে ভোগ্যপণ্য ও শিল্প খাতে। নদীপথে জাহাজ চলাচলে বাধা, কাঁচামাল ও পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত তৈরি করছে। টিকে গ্রুপের বিজনেস ডিরেক্টর মো. মোফাচ্ছেল হক বলেন, “জ্বালানি তেলের অভাবে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব পড়ছে। ঢাকার বাইরে সমস্যা প্রকট, দ্রুত সমাধান না হলে বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।”
মেঘনা গ্রুপও একই সমস্যার মুখোমুখি। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, “চট্টগ্রাম থেকে নদীপথে পাঁচ হাজার টন পণ্য আনার জন্য ডিজেলের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। উৎপাদন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পদ্মা ও মেঘনা অয়েলে দুই সপ্তাহ ধরে নয় লাখ লিটার তেলের পে-অর্ডার থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ মেলেনি। আমরা বৈশ্বিক সংকট বিবেচনায় ১৫-২০ শতাংশ কম নিতেও রাজি আছি।”
মেঘনা গ্রুপের পণ্য সারা দেশে সাড়ে তিন হাজার ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের মাধ্যমে পৌঁছায়। তবে জ্বালানি সংকটে ট্রাক চালানো যাচ্ছে না, ফলে বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
আকিজ বশির গ্রুপও ডিজেল অভাবে আমদানি কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহনে সমস্যায় পড়েছে। গ্রুপের হেড অব গ্রুপ সাপ্লাই চেইন মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, “আমাদের নিজস্ব পাঁচটি জাহাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেলের মাত্র ৪০ শতাংশ পাচ্ছি। মাদার ভেসেল থেকে সময়মতো পণ্য খালাস না হলে ফ্রেইট খরচ বাড়বে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া থেকে আসা জাহাজের ভাড়া ইতিমধ্যেই প্রতি টনে ৬-১০ ডলার বেড়ে গেছে। অভ্যন্তরীণ সংকট বাড়লে এই ব্যয় আরও বাড়বে।”
ডিজেলের অভাবে বড় প্রভাব পড়েছে আমদানি পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লাইটার জাহাজ চলাচলে। লাইটার জাহাজে জ্বালানি সংকটের কারণে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করেও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। মডার্ন মেরিন-২ নামের একটি লাইটার জাহাজে তিন হাজার লিটার চাহিদার বিপরীতে মাত্র এক হাজার লিটার ডিজেল সংগ্রহ করা গেছে। ফলে বাকি তেল না পাওয়া পর্যন্ত জাহাজ অপেক্ষা করতে বাধ্য।
লাইটার জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপক সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে প্রতিদিন ৭০-৮০টি লাইটার জাহাজ বরাদ্দ থাকে। প্রতিটি ভয়েজে গড়ে তিন হাজার লিটার তেল প্রয়োজন। কিন্তু সরবরাহ পাচ্ছে মাত্র ৫০ হাজার লিটার, যা চাহিদার অর্ধেকেরও কম।
চট্টগ্রামের অফডক ও কনটেইনার ডিপোগুলোর কার্যক্রম সচল রাখতে প্রতিদিন ৬০-৬৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খলিলুর রহমান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের অনুরোধ করেছেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল। গত অর্থবছরে ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৪৪ লাখ টন। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ২৩ লাখ টন ডিজেল আমদানি হয়েছে, যার ৬৫ শতাংশ এসেছে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে। এছাড়া ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানি করা যায়।
শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা সতর্ক করেছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এর প্রভাব সরাসরি বাজারদর, উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়বে।

