বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের মধ্যে বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সরকার এলএনজি সংকট এড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে। খোলা বাজার থেকে বেশি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় এলএনজি নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, আগামী এপ্রিল মাসের জন্য দেশের চাহিদা মেটাতে মোট নয়টি এলএনজি কার্গো কেনা হবে। এর মধ্যে আটটি স্পট মার্কেট থেকে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বিকল্প উৎস থেকে আনা হবে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমান জানান, “এপ্রিলের চাহিদা অনুযায়ী নয়টি কার্গো নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ২৫ মার্চ গৃহীত হয়েছে।”
বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি কিনে থাকে। কাতার এনার্জির কাছ থেকে বছরে ৪০ কার্গো এবং ওমানের ওকিউটি থেকে ১৬ কার্গো এলএনজি আসে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ায় কাতার থেকে সরাসরি এলএনজি আমদানিতে সীমাবদ্ধতা এসেছে। ফলে এইবার একটি দীর্ঘমেয়াদি কার্গো আনা হচ্ছে অ্যাঙ্গোলা থেকে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আগে এপ্রিল মাসে ১১ কার্গো এলএনজি কেনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কাতারের উৎপাদন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং বিশ্ব বাজারে এলএনজির দাম বাড়ার কারণে সরবরাহ কমেছে। তাই পরিকল্পনার তুলনায় দুটি কার্গো কম আসছে।
সরকার দামকে অগ্রাধিকার না দিয়ে সরবরাহ নিশ্চিতকরণে গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ও গ্যাস খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। পেট্রোবাংলার সূত্র জানায়, স্পট মার্কেটে এখন প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি গড়ে ২২ ডলার, যা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আগে ৯-১০ ডলারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এর ফলে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি আগের অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হবে। মিজানুর রহমান বণিক বলেন, “এই অর্থবছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি প্রয়োজন হবে।”
আগের বছর প্রতি বছর গড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি রাখা হতো। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অতিরিক্ত কার্গো আনার কারণে ৮ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ভর্তুকি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাথমিকভাবে ৬ হাজার কোটি টাকার প্রাক্কলন থাকলেও তা এবার কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কাতার এনার্জি, ওমানের ওকিউটি ট্রেডিং এবং এক্সেলারেট এনার্জিসহ বড় সরবরাহকারীরা ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করেছে। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন সীমিত হয়ে গেছে। যদিও কাতার এনার্জি এখনও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করেনি, তবুও সরবরাহে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
দেশে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার মার্চের ১১ তারিখে স্পট মার্কেটে তিনটি এলএনজি কার্গো কিনেছে, যার ব্যয় প্রায় ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে দুইটি কার্গো এসেছে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এবং একটি যুক্তরাজ্য থেকে। যুক্তরাজ্যের টোটাল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড থেকে কার্গোটির দাম ৯০৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, প্রতি এমএমবিটিইউ ২১.৫৮ ডলার।
গত অর্থবছরের ৯ ডিসেম্বর একই প্রতিষ্ঠান থেকে এলএনজি আনা হয়েছিল ৪৩৬ কোটি টাকায়, প্রতি এমএমবিটিইউ ১০.৩৭ ডলার দরে। মিজানুর রহমান আরও জানান, “কাতার এনার্জির উৎপাদন পূর্ণ মাত্রায় শুরু না হওয়া পর্যন্ত এবং হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক এলএনজি সরবরাহ অনিশ্চিত থাকবে।”
এছাড়া, ২৬ মার্চ যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিস থেকে দুই কার্গো এলএনজি কিনতে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা, প্রতি এমএমবিটিইউ ১৯.৭৭ ডলার দরে। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে গড়ে ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ হয়। জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে।

