বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, সরকার আগামী কয়েক বছরে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নতুন নজর দিচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩২ সালের মধ্যে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, ২০৩৩ সালে দ্বিতীয় যমুনা সেতু এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে।
সেতু বিভাগ নতুন পদ্মা সেতু পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এলাকায় নির্মাণের বিষয়টি তদারকি করছে। দ্বিতীয় যমুনা সেতু বগুড়া-জামালপুর করিডোর, গাইবান্ধার বালাসী ঘাট থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ঘাট বা অন্য উপযুক্ত রুটে নির্মাণ হতে পারে। এই তথ্য জানা গেছে ১ মার্চ সেতু বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের নথি থেকে। বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রাক্কলন ও পরবর্তী দুই বছরের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ জানান, যমুনা সেতুর সংযোগ সড়কগুলো ছয় লেনে উন্নীত হলেও, সেতু সংকীর্ণ থাকায় যানবাহন স্লো হয়ে যাচ্ছে। তাই দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে। সেতুর দৈর্ঘ্য, অবস্থান ও ব্যয় নির্ধারণের পরই সিদ্ধান্ত হবে, এটি সম্পূর্ণ সরকারি তহবিলে হবে নাকি বিদেশি অর্থায়ন বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) বাস্তবায়িত হবে।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর বিষয়ে সচিব বলেন, এটি সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ এবং প্রাথমিক সমীক্ষা শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ ও আরিচা-নগরবাড়ি রুট বিবেচনা করা হলেও, চূড়ান্ত রুট স্টাডি শেষে নির্ধারণ করা হবে।
বর্তমান যমুনা সেতু দুই পাশে দুই লেনের সার্ভিস সড়কসহ মোট ছয় লেনে উন্নীতকরণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবু সেতু সংকীর্ণ হওয়ায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। সেতু বিভাগ মনে করছে, নতুন সেতু নির্মাণ করলে ২০৩৩ সালের মধ্যে যানচলাচল সহজ হবে। বর্তমানে বগুড়া-জামালপুর, গাইবান্ধা-বালাসী ঘাট থেকে জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ ঘাটসহ তিনটি সম্ভাব্য রুটে সমীক্ষা চলছে।
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু প্রায় ৪ দশমিক ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হবে এবং পাটুরিয়া ও গোয়ালন্দকে যুক্ত করবে। এটি জাতীয় মহাসড়ক এন৫ ও এন৭-এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে। সেতুটি নির্মিত হলে রাজধানী থেকে দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সহজ হবে। পাশাপাশি বেনাপোল, দর্শনা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযোগ আরও কার্যকর হবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে প্রতিদিন ৩০ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচল করছে। সেতু বিভাগ ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটাতে এক্সপ্রেসওয়েকে “অত্যন্ত জরুরি” হিসেবে বিবেচনা করছে। সচিব রউফ বলেন, এটি দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। বিদ্যমান সড়ক ছয় লেনে উন্নীত হলেও, দ্রুত গতির যানচলাচল নিশ্চিত করতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রয়োজন। এক্সপ্রেসওয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থলপথের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে।
সেতু বিভাগের মতে, পদ্মা ও যমুনা নদীর ওপর দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ করলে আঞ্চলিক যোগাযোগ আরও সহজ হবে। পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়ে-১-এর সঙ্গে এবং যমুনা সেতু এশিয়ান হাইওয়ে-২ ও এএইচ৪১-এর সঙ্গে যুক্ত। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সেতু বিভাগ পাঁচটি খাতকে অগ্রাধিকার দেবে। এতে রয়েছে—
- বৃহৎ সেতু, টানেল ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণ
- এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ
- স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও আধুনিকায়ন
- সংযোগ সড়ক (এপ্রোচ রোড) নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ
- ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন
বর্তমানে সেতু বিভাগের আওতায় ৫৭টি প্রকল্প চলমান বা গৃহীতব্য। এর সম্ভাব্য ব্যয় ১২ লাখ ৯৬ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলমান প্রকল্পের জন্য ৩৬ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা এবং ভবিষ্যতের জন্য ১২ লাখ ৫৯ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলো হলো—
- ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ও সম্প্রসারণ
- ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
- পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ
- পায়রা সেতু নির্মাণ
- মেঘনা-ধনগোদা নদীর উপর নতুন সেতু নির্মাণ। সেতু বিভাগের এ উদ্যোগ দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও নিরাপদ করবে।

