বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে এবং উদ্যোক্তাদের সংকট মোকাবেলায় পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, উৎপাদনমুখী অর্থনীতিকে সচল রাখতে বন্ধ কারখানাগুলোকে দ্রুত পুনরায় কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনা এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
গতকাল রবিবার ঢাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কনফারেন্স কক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিজনেস এডিটর, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় এবং সাংবাদিকদের মতামত শোনা হয়।
গভর্নর জানান, আগে থেকেই কিছু কারখানা বন্ধ ছিল। ৫ আগস্টের পর নতুন করে আরও কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এসব কারখানাকে কীভাবে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংকগুলোকে এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে উৎপাদন শুরু হলে উদ্যোক্তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারেন এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারেন। অন্যথায় কারখানার সম্পদ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর অর্থ ফেরত পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
বিনিয়োগ বাড়াতে আস্থা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক একসঙ্গে কাজ করছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা বড় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এই সংলাপ অব্যাহত থাকবে।
আর্থিক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন গভর্নর। তিনি বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে। কোনো ধরনের চাপ যেন সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে না পারে, সে বিষয়ে কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার প্রসঙ্গেও তিনি কথা বলেন। গভর্নরের মতে, বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই প্রক্রিয়া জটিল হলেও বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান এবং মামলা অর্থায়নকারী সংস্থার সহায়তায় দেওয়ানি মামলা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে আমানতকারীদের অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে নতুন উদ্যোগ হিসেবে ৬০০ কোটি টাকার একটি স্টার্টআপ তহবিল চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এপ্রিল থেকে কার্যক্রম শুরু হয়ে জুনে ঋণ বিতরণ শুরু হবে। যেসব স্টার্টআপ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানান গভর্নর।
দেশীয় চাহিদা বাড়িয়ে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা জরুরি। কৃষিঋণ মওকুফসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার সে দিকেই এগোচ্ছে। তবে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৭ শতাংশের নিচে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে গভর্নর বলেন, প্রতিষ্ঠানটি থেকে সরে আসার সুযোগ নেই। পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এমডি ও চেয়ারম্যান নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সেবার মান উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণে জোর দেওয়া হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবেলায় প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাত কয়েক মাস স্থায়ী হলেও আমদানি ব্যয় মেটাতে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে। বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।
ব্যালান্স অব পেমেন্টে চাপ কমাতে দুই বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে এবং জুনে আইএমএফ থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের কিস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে ঝুঁকি বাড়বে বলে সতর্ক করেন গভর্নর। এতে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশে ফিরে আসতে পারেন, ফলে রেমিট্যান্স কমার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ওপর চাপ বাড়বে। জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানোর চাপ মূল্যস্ফীতিও বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা থাকলে বাজেটে ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আরও কিছু পদক্ষেপের কথাও জানানো হয়েছে। কৃষি খাতে সহায়তা বাড়াতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো এবং নতুন পুনরর্থায়ন স্কিম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। রাজস্ব বাড়াতে আগামী ১ জুলাই থেকে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে।

