আগামী অর্থবছরের বাজেটের রূপরেখা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে তিনটি প্রধান বিষয় বৈশ্বিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার। অর্থনীতিবিদরা সতর্কতা অবলম্বন করে বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়নের ওপর জোর দিচ্ছেন। অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। রাজস্ব সংগ্রহ, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, মূল্যস্ফীতি ঝুঁকি এবং চলমান সংস্কার কর্মসূচি বিবেচনায় রেখে ব্যয়ের কাঠামো নির্ধারণ জরুরি।
গত শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজন করে প্রাক-বাজেট আলোচনা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী বৈঠকের শুরুতেই কর-রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। তিনি সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রকল্প গ্রহণ ও প্রাক্কলন প্রক্রিয়া উন্নত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তার শক্তিশালীকরণে পরামর্শ চান।
বৈঠকে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকি চাপ বৃদ্ধি পাবে। প্রবাসী আয়ের প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য তারা সতর্কতা অবলম্বন করে বাস্তব সক্ষমতার ভিত্তিতে রাজস্ব ও ব্যয়ের কাঠামো প্রণয়নের পরামর্শ দেন। সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “আগামী বাজেটে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। সামাজিক খাতের প্রতিশ্রুতি এবং প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে উন্নয়ন ব্যয়ও বাড়াতে হবে। কিন্তু পর্যাপ্ত রাজস্ব থাকবে কিনা—এটাই মূল প্রশ্ন।”
তিনি আরও বলেন, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ নিম্নমুখী। এজন্য সঠিক রাজস্ব কাঠামো ও ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থায়ন পরিকল্পনা জরুরি। বড় নতুন প্রকল্প নেওয়ার সময় নয়, অগ্রগতি ৮০ শতাংশের বেশি প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে হবে। কম অগ্রগতি প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করে প্রয়োজনে স্থগিত রাখা উচিত।
ড. ফাহমিদা বলেন, বাজেট খুব বড় বা খুব ছোট হওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত সংকোচন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে না, আবার বড় বাজেটের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ নেই। ব্যাংকনির্ভর ঋণ বাড়ালে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ে। এজন্য পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবহার ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর।
এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণ, পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমানো, কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ ও কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশও করেন তিনি। সরকারি ও বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির কারণে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, তাই সুদের হার কমানো নিয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দেন।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাজেট প্রণয়নে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ।”
তিনি আরও বলেন, এই বছরের বাজেট খুব বড় করা উচিত নয়। সংকোচনমূলক বাজেট ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ জরুরি। খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি, জ্বালানি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সময়মতো অর্থছাড়, দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের ঘন ঘন সমস্যা সমাধানেও গুরুত্ব দিতে হবে।
মাহবুব আহমেদ বলেন, “ব্যাংকগুলো ঝুঁকিমুক্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বেশি বিনিয়োগ করছে, এতে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং কর রাজস্ব বৃদ্ধি ও পুঁজিবাজার উন্নয়ন অপরিহার্য।”

