দেশের সর্বোচ্চ উৎপাদন মৌসুম ইরি-বোরো ধানের চাষাবাদ এখন শীর্ষে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের কৃষকদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করেছে। সার ও সেচের সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় কৃত্রিম সার সংকট তৈরি হয়েছে, বাজারে দাম বেড়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের অনিয়মিত সরবরাহ সেচ কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।
সরকার বলছে, চলতি বোরো মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত সারের মজুদ আছে। তেলের অভাবে সমস্যা হলে কৃষক ও পাম্প মালিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। তবুও মাঠ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, চাহিদা অনুযায়ী সার ও ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক কৃষক উচ্চ দামে সার কিনতে বাধ্য হয়েছেন। ডিজেলের অভাবে সেচ সময়মতো দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
নওগাঁ সদরের হোগলবাড়ি গ্রামের কৃষক বজলুর রহমান বলেন, কয়েকদিন ধরে ডিজেল সংকটের কারণে পাম্প মালিকরা ঠিকমতো পানি দিচ্ছেন না। শুধু আল্লাহর রহমতে কয়েকদিন বৃষ্টির কারণে সমস্যা প্রকট হয়নি। তবে আবহাওয়া বিরূপ হলে ক্ষেতের ক্ষতি হতো।”
ওই এলাকার পাম্প মালিক আইয়ুব মিয়া বলেন, এ এলাকায় কোনো পাম্প বা দোকানে তেল নেই। মাঝে মাঝে সামান্য তেল মিললেও সেটা পর্যাপ্ত নয়। আমরা সঠিকভাবে সেচ পরিচালনা করতে পারছি না।” কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহাম্মদ জানিয়েছেন, চলতি বোরো মৌসুমে কোনো সমস্যা দেখা দিচ্ছে না। পর্যাপ্ত সার আছে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, সার সংকট মোকাবিলার জন্য দেশের বন্ধ কারখানা খোলা ও বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
সার ও ডিজেলের বাজার পরিস্থিতি
সরকার সারের দাম বৃদ্ধি করেনি। তবে ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছে। নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর, জয়পুরহাট ও বগুড়া জেলায় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রতি কেজি ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি বিক্রি হচ্ছে।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার কাজল মিয়া বলেন, ডিলাররা আগে না জানিয়ে প্রতি কেজি ৩–৫ টাকা বেশি নিচ্ছে। আমরা বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনছি।” মালিবাড়ি ইউনিয়নের মামুন মিয়া জানিয়েছেন, ৩০–৩৫ বস্তা সার কিনতে হয়েছে। খুচরা দোকান থেকে প্রতি বস্তা ১৫০–২০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে।” কৃষকরা বলছেন, ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দাম রাখছেন। এর ফলে উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশের সারের বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতার। দেশের কারখানাগুলোতে উৎপাদিত সারেও আমদানি করা গ্যাসের উপর নির্ভরতা রয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বিসিআইসির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান জানান, “যুদ্ধে প্রভাবিত রুট ছাড়া সব বিকল্প উৎস থেকে সার আমদানির সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। এছাড়া দুবাইয়ের সঙ্গে জিটুজি চুক্তি কার্যকর হলে ৩ লাখ টন সার সরবরাহ করা হবে।”
সরকার বলছে, দেশে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন, মিশরসহ বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করা হচ্ছে।” বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে:
- ইউরিয়া: ৫.৫ লাখ টন
- টিএসপি: ৩.২১ লাখ টন
- ডিএপি ও এমওপি: ৫.৩৩ লাখ টন
- এমওপি: ৩.৩১ লাখ টন
দেশের বোরো আবাদের ৬০% সেচ ডিজেলচালিত। ডিজেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, উৎপাদন কমলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে। ডিজেলের অভাবে সেচ দিতে না পারলে বোরো ধানের ফলন কমবে।”
বর্তমানে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার ডিজেল কিনতে পারছেন। খুচরা দোকানগুলোতে লিটারে ৫–১০ টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে। এতে প্রতি হেক্টরে অতিরিক্ত ৩০০–৫০০ টাকা খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, প্রয়োজনে কৃষক ও পাম্প মালিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে তদারকি করছেন।” মাঠ পর্যায়ের সরেজমিন তথ্য অনুযায়ী, দেশের কোনো জমিতে ডিজেলের অভাবে সেচ দেওয়া যায়নি। সার ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার নিচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ:
- দেশের বন্ধ সার কারখানা চালু করা।
- বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানো।
- উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা, যাতে যেকোনো সরবরাহকারী অংশ নিতে পারে।
- ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া কারখানা সপ্তাহখানেকের মধ্যে চালু করার পরিকল্পনা।
সরকার বলছে, চলতি বোরো মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। তবে আমন মৌসুমের জন্যও বিকল্প উৎস থেকে সারের আমদানি নিশ্চিত করা হচ্ছে। সার ও ডিজেলের অভাবে:
- সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে
- বোরো ধানের ফলন কমতে পারে
- খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে
কৃষকরা ডিজেল ও সার সংগ্রহে অতিরিক্ত খরচ করছেন। সারের কৃত্রিম সংকট, তেলের দাম বৃদ্ধি ও বিধিনিষেধ উৎপাদনের খরচ বাড়াচ্ছে। চলতি বছর বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা: ৫০ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর। সরকারের পদক্ষেপ থাকলেও কৃষকরা উদ্বিগ্ন।
ইরি-বোরো মৌসুমে সার ও ডিজেলের সংকট দেশের কৃষক ও পাম্প মালিকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত মজুদ ও বিকল্প উৎসে আমদানি নিশ্চিত করা হলেও বাজারে কৃত্রিম সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের উদ্বিগ্ন রাখছে। ডিজেল ও সার সরবরাহে কোনো বিঘ্ন হলে বোরো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

