প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, রাজস্ব আয় বাড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
গতকাল রবিবার (২৯ মার্চ) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতি ধসে গেছে। কর-জিডিপি অনুপাত একেবারে তলানিতে। আমরা একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছি।” তার সঙ্গে ছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
তিতুমীর অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকার কাগজে-কলমে রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দেখাত, বাস্তব আদায়ের সঙ্গে এর কোনো মিল ছিল না। তিনি বলেন, “দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন, যা ৭ শতাংশেরও নিচে। পশ্চিম এশিয়া ও ইরানকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। এক কথায়, যুদ্ধের প্রভাব অর্থনীতিতে গভীর।”
প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি আরও বলেন, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে জিডিপি হিসাবকে স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত করতে হবে। অতীতে ‘ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে’ দেখানো জিডিপি প্রবৃদ্ধি সংশোধনে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, রাজস্ব আহরণে ডিজিটাল সংস্কার ও অটোমেশন জোরদার করা হচ্ছে। নতুন আইবাস প্লাস প্লাস সিস্টেম চালু করার মাধ্যমে অসংগতি সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, “একদিকে লুটপাট ও গোষ্ঠীতন্ত্রের কারণে কর-জিডিপি হার তলানিতে, অন্যদিকে আয়ের তথ্য বাস্তবের সঙ্গে মেলে না।”
আইবাস প্লাস সিস্টেম শক্তিশালী করার মাধ্যমে কর ফাঁকি কমিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো হবে। জিডিপির প্রকৃত চিত্র ও কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলাফল বাস্তবমুখী হবে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। সরকারের প্রধান দায়িত্ব সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। ধর্মীয় নেতাদের জন্যও বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কৌশল হিসেবে তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। “বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে, আর করের পরিমাণও বাড়বে—করহার না বাড়িয়েই।” বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ ঋণ কমানো এবং সামগ্রিক সম্পদ বৃদ্ধিকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিতুমীর। তিনি আশাবাদী, ভ্যাট, শুল্ক ও আয়করে চতুর্থ প্রান্তিকে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি রাজস্ব আদায় হবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, সরকার আগের মতো দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়াবে না। সামাজিক সুরক্ষা স্থানীয় রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হবে। রাজস্ব আয় বাড়াতে তিনটি টাস্কফোর্স দিন-রাত কাজ করছে। কর ফাঁকি ও জালিয়াতি রোধ, করছাড় সংস্কৃতির অবসান, অপচয় হ্রাস এবং কর্মকর্তাদের পারফরম্যান্সভিত্তিক প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানো হবে। নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে এই মাপের কর-জিডিপি উন্নীত করা হবে।
এনবিআরকে দুই ভাগ করার সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক আখ্যা দিয়ে তিনি জানান, এ বিষয়ে আলোচনা করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি আশ্বাস দেন, জনগণের বোঝা না বাড়িয়ে তেল-গ্যাসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ করবর্ষে অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এবার নতুন করে চালু করা অনলাইন Time Extension’ অপশনেই সময় বৃদ্ধির জন্য পাঁচ হাজারের বেশি আবেদন ইতোমধ্যেই মঞ্জুর হয়েছে।
এখন পর্যন্ত ৫০ লাখের বেশি করদাতা নিবন্ধন করেছেন, আর ৪১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি রিটার্ন দাখিল করেছেন। সময় বৃদ্ধির আবেদন অনুমোদিত হলে করদাতারা কোনো জরিমানা ছাড়াই রিটার্ন দাখিল করতে পারছেন। তবে আবেদন করতে হবে ৩১ মার্চের মধ্যে।

