দেশে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন গত আট বছরে প্রায় ৩৭ শতাংশ কমেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দৈনিক গড়ে স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন ছিল ২৬৩ কোটি ঘনফুট। এরপর ২০১৮ সালে একদিনে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হয়। কিন্তু গতকাল তা নেমে এসেছে ১৭০ কোটি ঘনফুটে।
স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদেশ থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করতে হচ্ছে পেট্রোবাংলাকে। বাংলাদেশে এলএনজির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্য। খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সেখানে চলমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ২৫২ কোটি ৯৮ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে আসে ৮২ কোটি ২৪ লাখ ঘনফুট এবং স্থানীয় উত্তোলন ১৭১ কোটি ঘনফুট। স্থানীয় উৎপাদনের বড় অংশ আসে বিদেশী কোম্পানি শেভরন ও তাল্লোর মাধ্যমে, যারা সরবরাহ করছে ৯৫ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট। অন্যদিকে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি দিচ্ছে ৭৫ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট।
আট বছর আগে ২০১৮ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি মিলিয়ে দেশে দৈনিক ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করত। এটি শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতে সরবরাহ হতো। সময়ের সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকার আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করছে।
পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। এগুলোতে সিলেট, জালালাবাদ, তিতাস, হবিগঞ্জ, বেগমগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, ফেনী, ফেঞ্চুগঞ্জ, কামতা, মেঘনা, নরসিংদী, কৈলাসটিলা, রশিদপুর, বাখরাবাদ, সেমুতাং, কুতুবদিয়া, শাহবাজপুর, সাংগু, সালদা নদী, বিবিয়ানা, মৌলভীবাজার, বাংগুড়া, সুন্দলপুর, রূপগঞ্জ, শ্রীকাইল, ভোলা-নর্থ, জকিগঞ্জ ও ভোলা-ইলিশা অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে ২০টি ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে।
স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে ৫০টি নতুন গ্যাস কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালে এ কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে ৬১ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমায় ৩০টির বেশি কূপ খনন করা যায়নি। খনন হওয়া কূপ থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট মজুদ নিশ্চিত হলেও গ্রিডে যুক্ত হয়েছে মাত্র ১৭ কোটি ঘনফুট। এ কূপের বেশিরভাগ ভোলার দ্বীপ অঞ্চলে হওয়ায় পাইপলাইন সংকটের কারণে গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনা যাচ্ছে না।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যে আমরা স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। শ্রীকাইল এবং বিয়ানীবাজার থেকে ইতোমধ্যেই কিছু গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। স্থানীয় কূপ খনন ত্বরান্বিত করতে আমরা নতুন দুটি রিগ কেনার উদ্যোগ নিয়েছি। গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর জন্য আমাদের কাজ অব্যাহত রয়েছে।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলছেন, “দুই দশক ধরে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যত স্থবির। যে উৎপাদন আছে, তা কমে গেছে। আবিষ্কার ও অনুসন্ধানকে নিষ্ক্রিয় রেখে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি।”
স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। কাতার এনার্জি এবং ওমানের ওকিউটির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হয়েছে। কাতারের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি, ওকিউটির সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তি। বছরে কাতার থেকে ১.৮–২.৫ মিলিয়ন এবং ওমান থেকে ১–১.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি আসছে। ২০২০ সালে স্পট মার্কেট থেকেও আমদানি শুরু হয়।
২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি কেনায় ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, ব্যয় প্রাক্কলন ৫১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭৫ কার্গো এলএনজি আনা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে চলতি মাসে দ্বিগুণ দামে পাঁচ কার্গো কিনতে হয়েছে।
দেশে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে আরও অনুসন্ধান ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। নতুন ল্যান্ড বেইজড টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলমান। আগামী পাঁচ বছরে ১১৭টি কূপ খননের মাধ্যমে ১৫৩ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

