দেশের রাজস্ব কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সারচার্জের বিকল্প হিসেবে সম্পদ কর (ওয়েলথ ট্যাক্স) এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ওপর কর (ইনহেরিটেন্স ট্যাক্স) চালুর পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি। এতে উচ্চ সম্পদশালীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পথ খুলতে পারে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
আজ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) এনবিআরের সম্মেলন কক্ষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াবের প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন সংগঠনটির সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমানও।
স্বাগত বক্তব্যে এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, সম্পদ কর আইন পুনরায় চালুর সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। এটি কার্যকর হলে আয়করের বাইরে সম্পদশালীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায় সম্ভব হবে। বর্তমানে যে সারচার্জ ব্যবস্থা রয়েছে, সেটির পরিবর্তে এই কর ব্যবস্থা চালুর চিন্তা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে উত্তরাধিকার কর চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। চেয়ারম্যান বলেন, দেশে অনেকেই পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে বিপুল সম্পত্তি পান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সম্পত্তির ওপর কর আরোপের নজির রয়েছে। বাংলাদেশেও বিশেষ করে উচ্চমূল্যের সম্পত্তি বা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অবস্থিত সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তরের সময় কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। মিউটেশন বা মালিকানা হস্তান্তরের আগে এই কর নেওয়া হতে পারে।
রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা কমাতে সুশাসনের ওপর জোর দেন আবদুর রহমান খান। তিনি বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থায় ‘লিকেজ’ বা ফাঁকফোকর বন্ধ করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সৎ, দক্ষ ও পরিশ্রমী কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা গেলে রাজস্ব ফাঁকি কমবে এবং আয় বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
ব্যবসা সহজ করতে কাস্টমস ও বন্ড ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। জাতীয় সিঙ্গেল উইন্ডো চালুর পাশাপাশি সেটিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে কার্যকরভাবে কাজ করছে। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের সমস্যা বন্ড ম্যানেজমেন্টেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের আনুষঙ্গিক পণ্য এবং ডিউটি এক্সপোর্টারদের ইউটিলাইজেশন পারমিট এখন অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে। পুরো বন্ড ব্যবস্থাপনাকে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করা হচ্ছে।
অডিট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ম্যানুয়াল পদ্ধতি বন্ধ করার সিদ্ধান্তের কথাও জানান এনবিআর চেয়ারম্যান। আগে অডিট নির্বাচন প্রক্রিয়াতেই জটিলতা তৈরি হতো। এখন ভ্যাটের ক্ষেত্রে ২০টি ঝুঁকি-ভিত্তিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আয়করের ক্ষেত্রে ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে শতভাগ অনলাইন রিটার্ন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তথ্য ব্যবস্থাপনায় কোনো জটিলতা না থাকে।
রাজস্ব আদায়ের সাম্প্রতিক অগ্রগতিও তুলে ধরেন তিনি। জানান, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগের বছরের তুলনায় ২৮ হাজার কোটি টাকা বেশি আদায় হয়েছে। আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট—এই তিন খাতে আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এর ফলে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হবে বলে আশা করছে এনবিআর।

