জাতীয় রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। করদাতাদের জন্য প্রক্রিয়াকে সহজ ও কার্যকর করতে নতুন এক পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কর রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা চালু করা হবে।
রাজধানীতে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট বৈঠকে এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ শুধু কর আদায়ের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনবে না, বরং সামগ্রিক রাজস্ব কাঠামোকে আধুনিক ও কার্যকর করে তুলবে।
নতুন ব্যবস্থায় করদাতারা সারা বছর ধরে চারটি ধাপে রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। প্রথম প্রান্তিকে যারা রিটার্ন দেবেন, তারা বিশেষ প্রণোদনা বা রিবেট পাবেন। দ্বিতীয় প্রান্তিকে রিটার্ন দাখিলকারীরা স্বাভাবিক হারে কর দেবেন। তৃতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে রিটার্ন জমা দিলে তুলনামূলক বেশি কর দিতে হবে। একই পদ্ধতি কর্পোরেট করের ক্ষেত্রেও প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে করদাতারা নিজের সুবিধা অনুযায়ী সময় নির্ধারণ করতে পারবেন।
এনবিআর মনে করছে, এ উদ্যোগ কর পরিপালনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সহায়ক হবে। চেয়ারম্যান জানান, বর্তমান রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত দেশের সামাজিক নিরাপত্তা, পরিচালন ব্যয় ও কর্মসংস্থানমুখী অবকাঠামো উন্নয়নের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। এ ঘাটতি কাটাতে সম্পদ কর পুনঃপ্রবর্তন এবং উত্তরাধিকার কর চালুর বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও সহজ করতে প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এনবিআর ইতোমধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার কাজ শুরু করেছে। এর ফলে করদাতাদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য—যেমন জমার পরিমাণ, মুনাফা, কাটা কর ও ব্যাংক চার্জ—স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্ন ফরমে যুক্ত হবে।
এতে আলাদা করে সনদ সংগ্রহের ঝামেলা কমবে। তবে এই তথ্য শুধুমাত্র করদাতাই দেখতে পারবেন, কর কর্মকর্তাদের এতে সরাসরি প্রবেশাধিকার থাকবে না।
সম্পদের তথ্য যাচাইয়ে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করছে এনবিআর। ডিপিডিসি ও ডেসকোর তথ্য ব্যবহার করে সম্পত্তির মালিকানা ও ভাড়া আয়ের তথ্য শনাক্ত করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে রাজস্ব তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা আনতে আইবাস সিস্টেম ও ট্রেজারি রেকর্ডের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে, যাতে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকে।
ভ্যাট ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন চেয়ারম্যান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে যেখানে খুচরা লেনদেন প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা, সেখানে ভ্যাট নিবন্ধন মাত্র ৮ লাখ। সম্ভাব্য সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ হওয়ায় এ খাতে বিস্তর ঘাটতি রয়েছে। এই ব্যবধান কমাতে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে এনবিআর জানায়, ইতোমধ্যে ৪২ লাখ করদাতা অনলাইনে রিটার্ন জমা দিয়েছেন। এছাড়া সময় বাড়ানোর জন্য ২০ হাজার ইলেকট্রনিক আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আহরণ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট খাতে গঠিত টাস্কফোর্সের কার্যক্রমে এই প্রবৃদ্ধি এসেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

