বিশ্ব অর্থনীতির সব খাতে ছড়িয়ে পড়েছে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের উত্তাপ। জ্বালানি তেল, সার, ভোজ্য তেল, খাদ্যশস্য, শিশুখাদ্য আমদানি এমনকি সোনার বাজারও এই যুদ্ধে প্রভাবিত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত পুরো বিশ্ববাণিজ্যের চিত্র পাল্টে দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে অবাধে জাহাজ চলাচল না করতে পারায় জ্বালানি খাতের সরবরাহে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
কাতার, সৌদি আরব, লিবিয়া সহ বিভিন্ন দেশের তেল ও গ্যাস কূপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। এক মাসের মধ্যে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ, আর জ্বালানির দাম লাফিয়েছে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। সংকট এড়াতে কিছু দেশ সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে, আর বাংলাদেশ দ্বিগুণ দামে এলএনজি আমদানি করছে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “এ যুদ্ধ সব হিসাব বদলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যা ভেবেছিল, তা হয়নি। ইরান সম্ভবত কোনোভাবেই পিছু হটবে না। তারা যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা ব্যবহার করছে। মনে হচ্ছে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে। বাংলাদেশে এর প্রভাব অন্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি পড়বে।”
কোভিড-১৯ মহামারির পর বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এত কঠিন সময় আর আসেনি। যদিও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যপণ্যের বাজারে প্রভাব ফেলেছিল, তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তবে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতি এখন অনিশ্চয়তার পথে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা জানিয়েছে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে এবং আগামী মৌসুমে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। কিছু অঞ্চলে খাদ্যসংকট তীব্র হতে পারে।
রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ একযোগে সাপ্লাই চেইনকে অস্থির করে দিয়েছে। সরবরাহ বিঘ্ন, শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের ঘাটতির কারণে প্রায় সব খাতে মূল্যস্ফীতি ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এক মাসের মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১২–১৫ শতাংশ বেড়েছে, এলএনজির দাম স্পট মার্কেটে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত লাফ দিয়েছে। গমের দাম বেড়েছে ১৮–২২ শতাংশ, সূর্যমুখী ও সয়াবিন তেল ২০–২৫ শতাংশ, চিনি ১৫–১৮ শতাংশ, ভুট্টা ও পশুখাদ্য ১২–১৭ শতাংশ। এর প্রভাব পড়ছে পোলট্রি ও গবাদি পশুর মাংসেও।
সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচ কয়েক জায়গায় চারগুণ বেড়ে গেছে। নিরাপত্তার কারণে বিভিন্ন রুটে জাহাজ চলাচল কমেছে ৬০ শতাংশ। অধিকাংশ জাহাজ দীর্ঘ পথ ধরে কেপ অব গুড হোপ হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে। কনটেইনার ভাড়া বেড়েছে, বিমার প্রিমিয়াম ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। শিপিং ব্যয় বেড়ায় সব আমদানি পণ্যের দামও বাড়ছে।
শিল্প খাতেও প্রভাব পড়েছে। কাঁচামাল, ধাতু, রাসায়নিক, সার, কপার, নিকেল, অ্যালুমিনিয়াম, চিপ ও ইলেকট্রনিকস শিল্পে ব্যবহৃত ধাতুর দাম ২০ শতাংশ, পলিমার, পিইটি রেজিন ও প্লাস্টিকের দাম ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে কৃষি খাতে। উৎপাদন কমবে, কারণ কাতার থেকে সার সরবরাহকারী দেশগুলো কৃষিপণ্যের মূল চাহিদা মেটায়। ইতিমধ্যে সারের দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, কিন্তু অনেক দেশই প্রয়োজন মতো সার পাচ্ছে না। সরবরাহ চেইন প্রায় ভেঙে পড়েছে। ফলে আসন্ন মৌসুমে কৃষি উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমতে পারে।

