দেশের বড় ছয়টি শিল্পগোষ্ঠীর বিদেশে রাখা অর্থ খুঁজে বের করতে ব্যাংকগুলো তৎপর হয়েছে। ইতিমধ্যেই দেশের ১০টি ব্যাংক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ৩৬টি অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি (নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট বা এনডিএ) সই করেছে। মোট চুক্তি সংখ্যা হবে ৫৯টি, বাকিগুলো এখনো প্রক্রিয়াধীন।
ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া এই শিল্পগোষ্ঠীর কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্যই চুক্তি করা হয়েছে। এনডিএর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ জুনের মধ্যে ব্যাংকগুলো বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারে উদ্যোগ নেবে। সমন্বয় করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উল্লেখ্য, এসব শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক দখল, লুটপাট ও আর্থিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তাদের কারণে পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করা হচ্ছে। এছাড়া কয়েকটি ব্যাংক এখনও আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না।
ছয়টি শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী আরামিট গ্রুপ, প্রয়াত সিকদার গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ এবং নাসা গ্রুপ। এদের মধ্যে নজরুল ইসলাম মজুমদার দীর্ঘ ১৫ বছর বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)-এর চেয়ারম্যান ছিলেন, যিনি নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যানও ছিলেন।
ছয়টি গ্রুপের মোট ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ২৪ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এর বড় অংশ ইতিমধ্যেই খেলাপি। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ডিসেম্বরের শেষে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ। ফলে পুরো ব্যাংক খাত আস্থার সংকটে রয়েছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, যারা খেলাপি ঋণ নিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার করেছে, তাদের বিষয়েই আপাতত নজর দেওয়া হবে। নিয়মিত ঋণগ্রহীতারা বা ব্যবসা সচল থাকলে এখনই কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। তবে বিশেষ সুবিধায় ঋণ নবায়ন পাওয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে কেউ খেলাপি হলে তাদের বিষয়েও খোঁজ শুরু হবে।
এনডিএর মাধ্যমে চুক্তি করা প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত বহুজাতিক আইনি ও ব্যবসায়িক পরামর্শক। এরা পাচার করা অর্থ উদ্ধারের কাজেও নিয়োজিত থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, যদি অর্থ উদ্ধার সম্ভব হয়, তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান একটি অংশ কমিশন হিসেবে পাবে। এতে ব্যাংকগুলোর আলাদা কোনো ব্যয় হবে না। ইতিমধ্যেই ঢাকায় এসে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন একাধিক আইনি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি।
পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে:
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। ক্ষমতা হস্তান্তরের পর সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বাইরে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনার জন্য পুনর্গঠন করে আন্তসংস্থা টাস্কফোর্স। এই টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।
পরবর্তীতে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার ও ১১টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য গঠিত হয় ‘যৌথ তদন্ত দল’। দলের নেতৃত্বে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সদস্য হিসেবে রয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর ও শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সাচিবিক দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। প্রয়োজনে আইন, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বয় সহায়তা দিচ্ছে।
তদন্তের আওতায় থাকা ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, জেমকন গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ ও আরামিট গ্রুপ। এই গ্রুপগুলোর পাশাপাশি মালিকদের ব্যক্তিগত আর্থিক বিষয়ও যাচাই করা হচ্ছে। যৌথ তদন্ত দল দেশের ব্যাংক ও অন্যান্য মাধ্যমে এদের অর্জিত সম্পদ এবং দেশে ও বিদেশে থাকা সম্পদ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করছে। ইতিমধ্যেই সবেই মামলা করেছে দুদক এবং আদালত অনেকের সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে টাস্কফোর্সের বৈঠকে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচারের তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম পর্যায়ে দেওয়ানি কার্যধারার জন্য ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে ৬টি গ্রুপকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করা হয়। এই ছয় গ্রুপের কাছে থাকা মোট খেলাপি ঋণের ৭৭ শতাংশ। তাদের তথ্য সুরক্ষিত রাখতে এনডিএ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পাচারের শিকার ব্যাংকগুলো কোনগুলো?
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে গত ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত সভায় পাচারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা অংশ নেন। সভায় জানানো হয়, দেশে সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য এখন আন্তর্জাতিক মানের সমান্তরাল আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অপরাধীকে দেশে বিচারের মুখোমুখি করা হবে, পাশাপাশি বিদেশে তাঁর পাচারকৃত সম্পদ শনাক্ত ও বাজেয়াপ্তের দেওয়ানি প্রক্রিয়া সমানতালে চলবে।
সভায় উঠে আসে, এস আলম গ্রুপের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন সাইফুল আলমের ছেলে আহসানুল আলম। এছাড়া একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের পাশাপাশি জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইউসিবি, সাউথইস্ট ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, কমার্স ব্যাংকও বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ২৫ হাজার ৩০ কোটি টাকা, যার বড় অংশ পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ।
সাইফুল আলম পরিবারের সদস্যরা ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এই নাগরিকত্ব ত্যাগ আদেশকে আদালতের মাধ্যমে অবৈধ ঘোষণা করেছে। একাধিক দেশে গ্রুপটির হোটেল ও সম্পদের খোঁজ পেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এখন এস আলমের সম্পদ উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসলামী ব্যাংককে। সম্পদ উদ্ধারের জন্য ১০টি এনডিএ (Non-Disclosure Agreement) স্বাক্ষরিত হবে, যার মধ্যে ইতিমধ্যেই তিনটি সম্পন্ন হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খাঁন বলেন, “এস আলমের বিদেশের সম্পদের খোঁজে আমরা ইতিমধ্যে বহুজাতিক একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছি। তথ্য পাওয়ার পর আমরা অর্থ উদ্ধারে চুক্তি করব। এর মাধ্যমে গ্রুপটির প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার ঋণের একটি অংশ আদায়ের আশা করছি।”
অপরদিকে, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী সম্পর্কিত মামলা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন তাঁর স্ত্রী রুকমিলা জামান। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, এসবিএসি ব্যাংকও ক্ষতির মুখে পড়েছে। সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পাচারকৃত সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইউসিবি, আল-আরাফাহ্ ও ইসলামী ব্যাংককে, এবং ইতিমধ্যেই ইউসিবি একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছয়টি এনডিএ সম্পন্ন করেছে।
|
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আরামিট গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকা, যার প্রায় পুরো অংশই খেলাপি। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এর সম্পদ বিদেশে পাচার করেছেন। ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) তার সম্পদ জব্দ করেছে। লন্ডনে তার ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী ও স্ত্রী ইমরানা জামান চৌধুরী তিনটি বিলাসবহুল স্থাপনার মালিকানা পরিবর্তন করেছেন, যার মূল্য প্রায় ৩ কোটি পাউন্ড (৪৯০ কোটি টাকা)।
বেক্সিমকো গ্রুপের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকে বেক্সিমকোর ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা, যার সবই খেলাপি। এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ইউসিবি, পদ্মা ব্যাংক, ডাচ্–বাংলা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও একীভূত পাঁচ ব্যাংকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেক্সিমকোর সম্পদের খোঁজ ও উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জনতা ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংককে। ব্যাংক দুটি ১১টি এনডিএ করবে, যার মধ্যে ৯টি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবর রহমান বলেন, “পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় আশা করি, বেক্সিমকোর খেলাপি ঋণের একটি অংশ আদায় করা সম্ভব হবে।” বেক্সিমকোর মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা, যার বড় অংশ খেলাপি।
সিকদার গ্রুপের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। ব্যাংকটি দেড় দশক সিকদার পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য ব্যাংক হলো একীভূত পাঁচ ব্যাংক, এবি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক। সিকদার পরিবারের বিদেশে রয়েছে কোম্পানি ও বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে। পাচার করা অর্থ উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংককে, এবং ৯টি এনডিএ সম্পন্ন হয়েছে। ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা, যার প্রায় সবই খেলাপি।
|
নাসা গ্রুপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একীভূত পাঁচ ব্যাংক। এছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবি, সাউথইস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, পূবালী ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও আল–আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংককে, যেখানে ১২টি এনডিএ হবে, ইতিমধ্যেই ৮টি সম্পন্ন হয়েছে। নাসা গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ২১৪ কোটি টাকা, যার প্রায় পুরো অংশই খেলাপি।
আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহমুদ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী তথ্যের জন্য চুক্তি করেছি। এরপর বাণিজ্যিক চুক্তি হবে। আশা করি খেলাপি ঋণের একটি অংশ আদায় করা সম্ভব হবে।”
ওরিয়ন গ্রুপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ইউসিবি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও মেঘনা ব্যাংক। অর্থ উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অগ্রণী ব্যাংক ও ইউসিবিকে। ১০টি এনডিএ হবে, এর মধ্যে ১টি সম্পন্ন। গ্রুপটির ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ১২ কোটি টাকা।
এর মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের ঋণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা, নাবিল গ্রুপের ৯ হাজার ৪০৫ কোটি, জেমকন গ্রুপের ২ হাজার ১১৩ কোটি এবং সামিট গ্রুপের ১ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। প্রিমিয়ার গ্রুপের ঋণের পরিমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তদন্ত ও টাকা উদ্ধারের জন্য চুক্তি বিষয়ে ছয়টি শিল্পগোষ্ঠীর বক্তব্য জানতে ই-মেইল ও মুঠোফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে বেশিরভাগের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাদের মধ্যে কিছু কর্ণধার কারাগারে, কেউ কেউ বিদেশে পলাতক রয়েছেন।
অন্য পাঁচটি শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে দুটির পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেছে। সামিট গ্রুপ প্রথম আলোকে লিখিতভাবে জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠান বা এর শেয়ারধারীরা কখনো কোনো অবৈধ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বা অনিয়মে জড়িত ছিলেন না। তারা বলেন, “বাংলাদেশে বা আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়নি। সব সময় আমাদের পূর্ণ আত্মবিশ্বাস আছে যে, যেকোনো অনুসন্ধানে প্রমাণিত হবে সামিট গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার বা আর্থিক অনিয়মের কোনো অভিযোগের ভিত্তি নেই।”
নাবিল গ্রুপের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেছেন, “আমাদের কোম্পানির নামে ব্যাংকগুলোতে থাকা ঋণ সব নিয়মিত। ব্যবসা ভালো চলছে। সব ঋণ আমরা শোধ করতে বাধ্য।”
অর্থ পাচারকৃত সম্পদ ফেরত আনার প্রক্রিয়ায় ‘প্লি বার্গেইন’ (মামলার সমঝোতামূলক প্রক্রিয়া) অংশ হিসেবে সাজা কমানোর সুযোগ নেওয়া হতে পারে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এটি হতে হবে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুযায়ী, সবার জন্য সমান মানদণ্ড নিশ্চিত করে এবং সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া মেনে।”
আগের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অন্যান্য গ্রুপ যেমন এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা, ওরিয়নের খেলাপি ঋণও কোটি কোটি টাকার এবং বিদেশে তাদের সম্পদ জব্দ বা অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। এসব গ্রুপের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলমান।
| পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে ‘প্লি বার্গেইন’–এর (মামলার একটি সমঝোতামূলক প্রক্রিয়া) অংশ হিসেবে সাজা কমানোর সুযোগ দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে তা হতে হবে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুসরণ, সবার জন্য সমান মানদণ্ড নিশ্চিত করা এবং সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া মেনে।
—টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান |
অর্থ ফেরত আনা কেবল কঠিন, অসম্ভব নয়:
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা একদিকে জটিল, অন্যদিকে অসম্ভব নয় বলে মনে করেন অভিজ্ঞরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে অর্থ উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যেসব দেশে অর্থ পাচার হয়েছে, সেই দেশগুলোর আদালতে প্রমাণ দেখাতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ, তবে সম্ভব।”
অভিযুক্তদের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়টি সরকারের ভেতরেও আলোচিত হচ্ছে। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে ‘প্লি বার্গেইন’–এর অংশ হিসেবে সাজা কমানোর সুযোগ দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তবে এটি হতে হবে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুসরণ করে, সবার জন্য সমান মানদণ্ড নিশ্চিত করে এবং সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া মেনে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, অন্যথায় যদি সমঝোতার প্রক্রিয়া সঠিকভাবে না করা হয়, তাহলে ব্যাংকগুলো বাস্তবে অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশে আরও এক দফা অপরাধের সুরক্ষা দিতে পারে। এতে রাষ্ট্র কিছুই পাবে না এবং অপরাধীরা ‘হিরো’ বা নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

