বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, পেট্রোল উৎপাদনে দেশ সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশি উৎস থেকেও পেট্রোলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় অকটেন পাওয়া যায়। তবে চাহিদা মেটাতে বিপিসি নিয়মিত অতিরিক্ত অকটেন আমদানি করে।
অনুসন্ধান বলছে, বিপিসির প্রকাশিত তথ্যের আড়ালে ‘ফাঁকফোকর’ আছে। বাস্তবে, আমদানি করা পরিশোধিত অকটেনকে দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল)-এর পেট্রোলের সঙ্গে মিশিয়ে বিএসটিআই মানের পেট্রোল তৈরি করা হয় অর্থাৎ, দেশে উৎপাদিত পেট্রোল পুরোপুরি দেশি উৎসের ওপর নির্ভরশীল নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে বিপিসি। দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় দেশজুড়ে প্যানিক বায়িং শুরু হওয়াও তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এছাড়া, নিয়মিত সরবরাহকারীরা এপ্রিল মাসে কয়েকটি পার্সেল সরবরাহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিপিসি দ্রুত স্পট মার্কেট থেকে অকটেন ও ডিজেল আমদানি শুরু করেছে। বিপিসি জানাচ্ছে, মার্চ মাসের প্রথম ২৯ দিনে দেশে বিক্রি হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৫০ মেট্রিক টন পেট্রোল। এ অনুযায়ী, দৈনিক গড়ে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন।
ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত জানান, “পূর্বে পেট্রোলের রন মান ছিল ৮০, এখন বিএসটিআই সেট করেছে ৮৯। আমাদের প্ল্যান্ট প্রায় ৬০ বছরের পুরানো। তাই উৎপাদিত পেট্রোলকে বিএসটিআই মানের করতে আমদানি করা অকটেনের সঙ্গে মিশিয়ে ব্লেন্ডিং করতে হয়।”
গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, সকাল পর্যন্ত দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে মজুত রয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৯১৯ টন। এর মধ্যে পেট্রোলের পরিমাণ ১১ হাজার ৪৩১ টন। ডেডস্টক ১০ শতাংশ বাদ দিলে সরবরাহযোগ্য পেট্রোলের মজুত আছে ১০ হাজার ২৯১ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টসহ ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে দেশে উৎপাদিত পেট্রোলের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ১৫ হাজার ৪৮৫ টন। দৈনিক গড় উৎপাদন দাঁড়ায় ৮৬৪.৩৪ মেট্রিক টন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিপিসির একজন কর্মকর্তা বলেন, “বিপিসি দেশি পেট্রোল ব্যবহার করে চাহিদা মেটায়, তবে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অকটেন উৎপাদন হয় না। তাই দেশের চাহিদা মেটাতে নিয়মিত অকটেন আমদানি করতে হয়। উৎপাদিত পেট্রোলকে বিএসটিআই মানের করতে আমদানি করা অকটেনের সঙ্গে ব্লেন্ড করতে হয়।”
বিপিসির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিক্রি হয়েছে ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন জ্বালানি তেল। এর মধ্যে পরিবহন খাতে ব্যবহার হয়েছে সর্বাধিক, মোট বিক্রিত জ্বালানির ৬৩.৪১ শতাংশ। কৃষিতে ১৫.৪১ শতাংশ, শিল্পে ৫.৯৬ শতাংশ, বিদ্যুতে ১১.৬৭ শতাংশ, গৃহস্থালিতে ০.৯৬ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ২.৫৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশের তিনটি বিপণন কোম্পানি ও ইস্টার্ন রিফাইনারি মিলিয়ে বিপিসিতে পেট্রোল মজুত সক্ষমতা রয়েছে ৩৭ হাজার ১৩ মেট্রিক টন। চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বিক্রি হয়েছে ৩৩ হাজার ৯৩৮ টন পেট্রোল, ফেব্রুয়ারিতে ৩৬ হাজার ৫৯ টন। তুলনামূলকভাবে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বিক্রি হয়েছিল যথাক্রমে ৩৪ হাজার ৯১৭ এবং ৪১ হাজার ১৯৯ মেট্রিক টন।
অর্থবছরভিত্তিক বিক্রির ধারা অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে পেট্রোল বিক্রি হয়েছিল ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৮৪৬ টন। পরের বছর বেড়ে হয় ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৬৪৭ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিক্রি ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৫৫৬ টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ লাখ ৩০ হাজার ৯৫২ টন, এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন। দৈনিক গড়ে বিক্রি দাঁড়ায় ১ হাজার ২৬৭ মেট্রিক টন।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পেট্রোল আমদানি হয় না, কিন্তু অকটেন নিয়মিত আমদানি করা হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ২ লাখ ৮৮ হাজার ২৮০ টন অকটেন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৫১৫ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৮৬৬ টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৪৭ টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫৮২ টন।
অকটেন ও পেট্রোল উভয়ই মোগাস (মোটর গ্যাসোলিন) হিসেবে পরিচিত। রন (রিসার্চ অকটেন নম্বর) অনুযায়ী, রন-৮৯ হলে তা পেট্রোল, আর রন-৯৫ হলে অকটেন। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে উৎপাদিত পেট্রোল বিএসটিআই নির্ধারিত মানের নয়। তাই বিপিসি উৎপাদিত পেট্রোলের সঙ্গে আমদানি করা পরিশোধিত অকটেন মিশিয়ে বিএসটিআই মানের পেট্রোল তৈরি করে।
ইআরএলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৯১ টন পরিশোধিত অকটেন আমদানি করে। একই সময়ে ইআরএলে উৎপাদিত পেট্রোলের পরিমাণ ৫৯ হাজার ১৫০ টন। এসব পেট্রোলের সঙ্গে অকটেন মিশিয়ে সরবরাহ করা হয়। সরকারি-বেসরকারি ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট থেকে পেট্রোল পাওয়া যায় ৩ লাখ ১৫ হাজার ৪৮৫ টন। এর ফলে বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো ওই অর্থবছরে ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন পেট্রোল বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে।
ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত বলেন, “আগে পেট্রোলের রন মান ৮০ ছিল। এখন বিএসটিআই পেট্রোলের রন নির্ধারণ করেছে ৮৯। আমাদের প্ল্যান্ট প্রায় ৬০ বছরের পুরানো। উৎপাদিত পেট্রোলকে বিএসটিআই মানের করতে পরিশোধিত অকটেনের সঙ্গে ব্লেন্ডিং করতে হয়।”
বাংলাদেশে বিএসটিআই মান অনুযায়ী সাধারণ পেট্রোলের ন্যূনতম রন বর্তমানে ৮৯। ২০১২ সালের আগে রন ছিল ৮০। পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং যানবাহনের ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিএসটিআই পর্যালোচনা করে ধাপে ধাপে রন উন্নত করেছে। ২০১২ সালে রন নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮৭, আর ২০১৯ সালে তা ৮৯ করা হয়।

