দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমকে সামনে রেখে সম্ভাব্য বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। জ্বালানি তেলের ঘাটতি এখন প্রায় প্রতিদিনের বাস্তবতা। দ্রুত এই সংকট কাটার কোনো ইঙ্গিতও নেই।
ডিজেলনির্ভর খাতগুলোতে চাপ সবচেয়ে বেশি। কৃষির বোরো মৌসুম সামনে থাকায় ডিজেলের চাহিদা আরও বাড়বে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিকল্প উৎস থেকে ডিজেল আমদানির চেষ্টা চললেও তা পরিস্থিতি সামাল দিতে যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন দায়িত্ব নেওয়া সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
দুর্নীতির অভিযোগ ও তদন্তে স্থবিরতা:
বিদ্যুৎ খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই খাতে অনিয়ম সবচেয়ে বেশি হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তদন্তের কথা বলা হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ না নিয়ে বরং সেগুলো বহাল রাখার মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এতে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তিগুলো যাচাই করতে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তারা তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে তদন্ত পরিচালনা এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইন সংস্থা যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। লক্ষ্য ছিল, চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন বা বাতিলের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা।
পর্যালোচনার আওতায় ছিল বেশ কিছু বড় প্রকল্প ভারতের গড্ডায় আদানি গ্রুপের ১,৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা ১,৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক প্রকল্প, মেঘনাঘাট ও আশুগঞ্জের একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো।
বিতর্কিত আইন ও একচেটিয়া সুবিধার অভিযোগ:
২০১০ সালে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ প্রণয়ন করা হয়। শুরুতে দুই বছরের জন্য করা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ১৪ বছর কার্যকর রাখা হয়। এই আইনের আওতায় প্রতিযোগিতা ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও জ্বালানি ক্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়। এমনকি এসব চুক্তি আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও ছিল না।
এই আইনের অধীনে ৯১টি বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে ওঠে, যার মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১১,৭০০ মেগাওয়াট। তবে অনেক কেন্দ্র চালু না রেখেও বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়েছে, যা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।
নির্দিষ্ট চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন:
ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তি নিয়ে বিশেষ বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ আছে, গোপনীয়তার মধ্যে চুক্তিটি সম্পন্ন করা হয় এবং চাহিদা না থাকলেও নির্দিষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য থাকার শর্ত রাখা হয়। একইভাবে ব্যবহৃত কয়লার দাম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অন্যান্য প্রকল্পে বিপুল ব্যয়ের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব চুক্তি বাতিল বা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নতুন সরকারের অবস্থান:
নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকার বিদ্যুৎ খাতের চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়নের কথা জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী পূর্ববর্তী সরকারের অনেক চুক্তিকে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষ্য, দেশের নিজস্ব সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিদেশি নির্ভরতা তৈরি করা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিটি চুক্তি পর্যালোচনা করা হবে এবং প্রয়োজন হলে সংশোধন বা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও নজির:
বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বৈদেশিক চুক্তি যাচাইয়ের সুস্পষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতে সংসদীয় কমিটি ও সুপ্রিম কোর্ট চুক্তি পর্যালোচনায় ভূমিকা রাখে। অতীতে চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের সঙ্গে করা বিভিন্ন চুক্তি সংসদীয় বিতর্ক ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংশোধন বা স্থগিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেও একইভাবে সংসদীয় বা কংগ্রেসীয় কমিটির মাধ্যমে চুক্তি যাচাই করা হয়। এতে জনগণের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
সামনে করণীয় কী: বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে,
- সব চুক্তি পুনর্মূল্যায়নে সংসদীয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে
- আইনি জটিলতা এড়াতে বিচার বিভাগীয় কমিশনের মাধ্যমে চুক্তির আইনগত দিক পর্যালোচনা প্রয়োজন
- কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালানো উচিত
- সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সালিশি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি
বিদ্যুৎ সংকটের সহজ কোনো সমাধান নেই। তবে অপচয় কমানো, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—স্বল্প খরচে টেকসই সমাধান নিশ্চিত করা এবং জনগণের আস্থা অর্জন করা।

