প্রায় দুই দশক পর জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য একটি বাস্তবতাভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের কাজ চলছে।
সরকারি সূত্র বলছে, এবারের বাজেটে ব্যয়সংকোচন নীতি অনুসরণ করা হবে। একই সঙ্গে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখায়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সবকিছু ঠিক থাকলে জুনের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উপস্থাপন করা হতে পারে। ইতোমধ্যে ব্যবসায়ী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে প্রস্তাবনা আহ্বান করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় শিল্প ও বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করাই হবে বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয় জরুরি। প্রণোদনা কাঠামো পুনর্বিন্যাস, শুল্ক ও কর ব্যবস্থার যৌক্তিকীকরণ এবং রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
সূত্র জানায়, সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন করা হবে। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতেও বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় সাড়ে আট থেকে নয় লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার হতে পারে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা।
ইতোমধ্যে সরকারের কিছু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু এবং দেড় বছরের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে এখন পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগও চলছে। এ কারণে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৬ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে এবং বিভিন্ন মহলের মতামত নেওয়া হচ্ছে। রাজস্ব বাড়াতে কর ফাঁকি রোধ, কর জাল বিস্তৃত করা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর নীতিও বাজেটে প্রতিফলিত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব বিবেচনায় জ্বালানি নিরাপত্তা এখন বড় অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আয়ের চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এবারের বাজেট প্রণয়ন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তাই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।
বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, ভর্তুকি কাঠামো সমন্বয়, কৃষিনির্ভর শিল্পে জোর এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
একই সঙ্গে পুঁজিবাজারে গতি ফেরাতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। প্রবাসীদের বিনিয়োগ বাড়াতে ‘ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে’ চালুর চিন্তাভাবনা চলছে, যাতে তারা সহজে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন। অতীতের অনিয়মের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আস্থা পুনরুদ্ধারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথাও বলা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সবার অংশগ্রহণে একটি গণমুখী, শিল্প ও ব্যবসাবান্ধব এবং রাজস্ব সম্ভাবনাময় বাজেট প্রণয়ন সম্ভব হবে।

