ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার এখন ভয়াবহ সংকটে আছে। শ্রমিক পাঠানো এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ সচল রাখতে সরকার দৃষ্টি দিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, জাপান ও সিঙ্গাপুরসহ প্রতিবেশী দেশে নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার প্রচেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমিক গ্রহণকারী দেশ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বন্ধ হয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পরও এটি খুলতে পারেনি। বর্তমান সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খোলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৮০ দিনের সরকারি অগ্রাধিকার কর্মসূচির মধ্যেও এটি অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ২০২২-২৪ সালের মধ্যে ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ জন শ্রমিক পাঠানো হয়। তবে ২০২৪ সালের ১ জুন মালয়েশিয়া সব সোর্স কান্ট্রি থেকে কর্মী নিয়োগ বন্ধ রাখে। পরে বাংলাদেশ ছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে পুনরায় শ্রমিক নিয়োগ শুরু করেছে মালয়েশিয়া। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিবাদ ও মতবিরোধের কারণে এ শ্রমবাজার এখনও খোলা সম্ভব হয়নি।
সম্পর্কিত ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, জনশক্তি রপ্তানিতে কিছু উদ্যোক্তাকে রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে দূরে রাখার চেষ্টা চলছে। তারা বলছেন, এটি দেশের এবং জনশক্তি রপ্তানির জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ। যারা কাজ করতে পারেন বা উদ্যোগ নিতে পারেন, তাদেরকে দ্রুত কাজে লাগানো জরুরি।
ব্যবসায়ীরা আরও উল্লেখ করেন, যে কোনো দেশে শ্রমিক পাঠানোর জন্য অবশ্যই একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। মালয়েশিয়ায় গত ধাপে কলিং ভিসা, শ্রমিক নিয়োগ অনুমোদন, বাংলাদেশের মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ অনুমতি ও বিএমইটি ছাড়পত্র সব প্রক্রিয়া মেনে সম্পন্ন হয়েছে। সরকারও প্রয়োজনীয় ট্যাক্স গ্রহণ করেছে।
তারা সতর্ক করেছেন, যদি এই প্রক্রিয়ার কারণে কোনো শ্রমিক বা লাইসেন্সধারীকে সাজা দেওয়া হয়, তবে এটি প্রমাণ করবে যে ‘আগের প্রক্রিয়াটা ভুল ছিল’। তখন বাংলাদেশের সরকারও অভিযোগের মুখে পড়বে। দেশের এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে লেখা হবে যে, ‘বাংলাদেশ সরকার শ্রমিক প্রেরণে অবৈধ কাজ করেছে; অর্থ ও মানব পাচার হয়েছে’। ব্যবসায়ীদের মতে, এর ফলে শুধু মালয়েশিয়ায় নয়, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে দেশের টিআইপি র্যাংকিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তাদের সতর্কবার্তা, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো লাইসেন্সধারীর বিরুদ্ধে সাজা দিলে, অন্য কোনো লাইসেন্সও ক্লিয়ারেন্স পাবে না। এক মামলার সাজা হলে মানব পাচার ও অর্থ পাচারের বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে যাবে। এতে মালয়েশিয়ার টিআইপি র্যাংকিংয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে এবং বাংলাদেশি শ্রমিকদের ভিসা দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মালয়েশিয়া কোন দলের সমর্থক দেখবে না; তারা শুধু দেখবে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ার কারণে তাদের টিআইপি র্যাংকিং হ্রাস পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, সরকার এবারও মালয়েশিয়ায় প্রায় একই প্রক্রিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর চেষ্টা করছে। তবে অতীতে শ্রমিক প্রেরণের কারণে ঢালাওভাবে রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা ও তদন্ত চলেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আলাদাভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে। মালয়েশিয়া সরকারও একাধিকবার চিঠি দিয়ে অপ্রমাণিত মামলাগুলো প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়েছে। সরকারের প্রতিশ্রুতির পরও ওইসব মামলা এখনও প্রত্যাহার হয়নি। ফলে এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিক পাঠালে ফের মামলার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা সতর্ক করেছেন, মামলার কারণে প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ও শ্রমিক গ্রহণকারী দেশগুলোর TIP র্যাংকিং নেমে যেতে পারে। এতে শ্রমিক নেওয়া দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা আরও বলেছেন, যারা মিথ্যা অভিযোগ তুলছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। সিআইডির আগের প্রতিবেদনে মিথ্যা অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা মনে করান, “কোনো শ্রমিক মানব পাচার বা অর্থ পাচারের মামলা করেননি। ২০২২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গিয়েছেন, সবাই কাজ পেয়েছেন, কারও অভিযোগ নেই।”
রেমিট্যান্সের দিক থেকে বাংলাদেশে ভালো ফলাফল এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ এবং ২০২২-২৪ দুই মেয়াদে ৭ লাখ ৫৪ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। এর ফলে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্সের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
- ২০২১-২২ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ১,০২১.৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
- ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১,১২৫.৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
- ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১,৭৪৪.৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
২০২২-২৪ মেয়াদে (২২ মাসে) প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। এর প্রভাব পরিস্কার, ২০২১-২২ সালের তুলনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ৭১ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটিতে থাকা প্রবাসীরা ২৮০ কোটি ৪৭ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করান, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং মিথ্যা অভিযোগ শ্রমিক প্রেরণ প্রক্রিয়াকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে, তবে রেমিট্যান্সের উত্থান এই খাতের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা প্রমাণ করছে।
মালয়েশিয়ার সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৫টি সোর্স কান্ট্রি থেকে মোট ১১ লাখ ৫ হাজার ২১৫ জন শ্রমিক নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা ৪ লাখ ৭১ হাজার ৪৭৬, যা মোটের ৪২.৭০ শতাংশ। অন্য সোর্স কান্ট্রির মধ্যে নেপাল ৩ লাখ ১৭ হাজার ৫১১ জন, ইন্দোনেশিয়া ১ লাখ ১২ হাজার ৯৫ জন, মিয়ানমার ৮০ হাজার ২২৯ জন, ভারত ৭৩ হাজার ৯৮৬ জন, পাকিস্তান ২৮ হাজার ৩২১ জন, ফিলিপাইন ১৪ হাজার ৩৪৭ জন, ভিয়েতনাম ২ হাজার ৮৯৭ জন, শ্রীলঙ্কা ২ হাজার ৯ জন, থাইল্যান্ড ৭৩১ এবং চীন থেকে ৭৩ জন শ্রমিক নিয়েছে মালয়েশিয়া।
মালয়েশিয়া সরকারের ২০২৫ সালের জাতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশটির মোট জনশক্তির প্রায় ১৫ শতাংশ বিদেশি শ্রমিকের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বর্তমানে দেশটিতে মোট বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। বয়সজনিত কারণে ও ভিসা বাতিলের কারণে শ্রমিকদের দেশে ফেরার সঙ্গে কিছু নতুন কোটা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৬ লাখ বিদেশি শ্রমিক নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, যা আগামী ছয় বছরে ১২ লাখ বা তারও বেশি হতে পারে।
তবে ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে নেপাল, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারসহ অন্যান্য সোর্স কান্ট্রি এখনও শ্রমিক পাঠাচ্ছে এবং অন্তত তিন লাখ শ্রমিক সেখানে পৌঁছেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে শ্রমিক পাঠাতে না পারায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালে আটকে পড়া ১৮ হাজার শ্রমিক এখনও পাঠানো সম্ভব হয়নি।
ভবিষ্যতের জন্যও ঝুঁকি রয়েছে। মালয়েশিয়া সরকার ২০২৬ সালের শেষের দিকে বিদেশি শ্রমিকের কোটা ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ৮০ শতাংশ দেশি ও ২০ শতাংশ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ হয়। কৃষিসহ অন্যান্য খাতে তিন ভাগের এক ভাগ ও দুই ভাগের এক ভাগ হারে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন, যদি দ্রুত বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ তৈরি না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক প্রেরণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা দেখা দেবে।
মালয়েশিয়ায় উচ্চ বেতন, নতুন সুযোগ ও বাধা:
মালয়েশিয়ায় বৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। তবে বিপুলসংখ্যক অবৈধ অভিবাসীও রয়েছেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী বিদেশি কর্মীদের কাজের অনুমতির জন্য বেতন সীমা বাড়ানো হয়েছে। বিদেশি পেশাজীবীদের তিনটি ধাপে বিভাজন করে বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে।
- ক্যাটাগরি-১: ন্যূনতম মাসিক বেতন এখন ২০ হাজার রিঙ্গিত, যা আগে ছিল ১০ হাজার। এই কর্মীরা সর্বোচ্চ ১০ বছর দেশটিতে অবস্থান করতে পারবেন।
- ক্যাটাগরি-২: বেতন সীমা ১০ হাজার থেকে ১৯,৯৯৯ রিঙ্গিত। ভিসার সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ বছর।
- ক্যাটাগরি-৩: আগে ৫ হাজার রিঙ্গিত, এখন ৫ হাজার থেকে ৯,৯৯৯ রিঙ্গিত। অবস্থানের সময়সীমা কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে ২০২৪ সাল থেকে নতুন শ্রমিক নিয়োগের ভিসা বন্ধ রয়েছে। নতুন নীতি কার্যকর হলে, যারা বর্তমানে মালয়েশিয়ায় আছেন, তাদের মধ্যে একটি বড় অংশকে মেয়াদ শেষে দেশে ফিরে আসতে হবে। তবে নতুন নিয়ম উচ্চ বেতনে নতুন শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
কেন বেশি সুযোগ?
জনশক্তি রপ্তানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, সৌদি আরবের পর একমাত্র দেশ মালয়েশিয়া, যেখানে অভিজ্ঞতা ছাড়াই শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হয়। জাপান বা কোরিয়া মতো দেশে ভাষা ও দক্ষতার প্রয়োজন হলেও, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় অভিজ্ঞতা ছাড়া শ্রমিক যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকারি জটিলতাগুলো দ্রুত নিরসন হলে, অল্প সময়ের মধ্যে কয়েক লাখ দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠানো সম্ভব।
বড় বাধা: মামলা ও অভিযোগ:
অতীতে যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি শ্রমিক পাঠিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগ উঠেছে। প্রথম মামলা করেন আলতাফ হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী। এরপর দুদক ও সিআইডি ধারাবাহিক মামলা চালিয়েছে।
মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশকে বহুবার অনুরোধ করেছে, দুই দেশের শ্রম অভিবাসন সংক্রান্ত ভিত্তিহীন অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করতে। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আজমান মোহাম্মদ ইউসুফ ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল লিখেছেন, “মানব পাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগগুলোর বেশিরভাগই ভিত্তিহীন এবং তা মালয়েশিয়ার সুনাম ক্ষুণ্ন করছে।”
বাংলাদেশ সরকার প্রতিশ্রুতি দিলেও মামলাগুলো বাস্তবায়ন হয়নি; বরং নতুন মামলা উঠেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই মামলাগুলোই এখনো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার প্রধান প্রতিবন্ধকতা। মালয়েশিয়া স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—অপ্রমাণিত অভিযোগ প্রত্যাহার না হলে তারা বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেবে না।
নেপথ্যের বিরোধ ও দ্রুত শ্রমবাজার খোলার প্রয়োজন:
সিঙ্গাপুর, কুয়েত, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগে সীমিত সংখ্যক এজেন্সির ওপর নির্ভর করে। বিগত ধাপে জিটুজি প্লাস চুক্তির আওতায় ১০১টি এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক নেওয়া হয়। তবে যারা ওই সময়ে সরাসরি শ্রমিক পাঠাতে পারেননি, তারা ১০১ এজেন্সিকে ‘সিন্ডিকেট’ বলে অভিহিত করে নানামুখী প্রচারণা চালাচ্ছে। এ কারণে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ধারা চলেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করান, এই বিরোধ দেশের শ্রমবাজারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা বলেন, “ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার লন্ডভন্ড। তেলের দাম এখন ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার এবং আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে। যুদ্ধ বন্ধ হলেও জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি মেরামতের জন্য বিশাল খরচ প্রয়োজন।
এতে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিকদের ফেরত আসতে হবে, যারা থাকবেন তাদেরও বেতন অনিয়মিত হবে। এর প্রভাব সরাসরি দেশের রেমিট্যান্সে পড়বে। এছাড়া রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই বিকল্প হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে শ্রমিক পাঠানো জরুরি। এই ক্ষেত্রে জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। তবে জাপানে শ্রমিক পাঠানো দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং দক্ষতা প্রয়োজন। দক্ষিণ কোরিয়াও সীমিত সংখ্যা গ্রহণ করে। সিঙ্গাপুর ছোট বাজার। সৌদি আরবের পর সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বাংলাদেশ থেকে সেখানে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ, আর আমরা এখনও খুলতে পারিনি।”
গোলাম মোস্তফা বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আলতাফ হোসেন নামে একজন ব্যবসায়ী অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগে মামলা করেন। সিআইডি তদন্তে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এরপর দুদক ও সিআইডি আলাদাভাবে কিছু মামলা করেছে। মালয়েশিয়া সরকারের নির্দেশে তাদের এন্টিকরাপশন কমিশন দীর্ঘ তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে। পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে। অভিযোগগুলো অসত্য। মালয়েশিয়া বারবার অপ্রমাণিত মামলাগুলো প্রত্যাহারের জন্য বাংলাদেশকে চিঠি দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও চিঠিতে জানিয়েছে এগুলো প্রত্যাহার করা হবে, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বাস্তবায়ন করেনি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়গুলো জানিয়েছি। মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সপরিবারে সফরের আমন্ত্রণ এসেছে। তার আগে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টরা মালয়েশিয়া সফর করে প্রকৃত অবস্থা দেখতে পারেন। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ। এর আগে এমন নজির নেই। তারপরও বহু মামলা হয়েছে। এসব মামলার কারণে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক TIP সূচক নেমে গেছে। এর প্রভাব শুধু জনশক্তি রপ্তানিতেই নয়, দুই দেশের রপ্তানি বাণিজ্যেও পড়ছে। তাই সব জটিলতা দূর করে দ্রুত শ্রমবাজার খোলার ব্যবস্থা করা জরুরি।”
নতুন শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ:
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. হাছানাত হুমায়ূন কবীর বলেন, “নতুন শ্রমবাজার খোলা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় নতুন শ্রমবাজার খোলার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। আমরা কিছু কর্মপন্থা উদ্ভাবনের চেষ্টা চালাচ্ছি। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশে উচ্চপর্যায়ের সফরের কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার জন্য ‘অপ্রমাণিত’ মামলা প্রত্যাহারের শর্ত বা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে চলমান মামলার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সচেতন রয়েছেন। এ বিষয়ে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।”
মহাপরিচালক আরও বলেন, “সৌদি আরবের পর সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। ২০১২ সালে এটি জিটুজি পদ্ধতিতে পরিচালিত হতো। ২০১৬ সালের মধ্যে মাত্র ৮ হাজার শ্রমিক পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। ২০১৫ সালে বেসরকারি সব এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ায় পাঠানো হলে তারা ১০টি লাইসেন্সের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানোর অনুমতি দেয়। সেই সময়ে ২ লাখ ৭৮ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে অসত্য প্রমাণিত হয়।
২০২২ সালে মালয়েশিয়ায় সব রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠানো হয়। তাদের মধ্য থেকে সরকারি বোয়েসেলসহ ১০১টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়া হয়। তারা বন্ধ হওয়ার আগে পৌনে ৫ লাখ শ্রমিক পাঠায়। সীমিত লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি আমাদের পক্ষ থেকে নয়, মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে। তবে মানব পাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে, যা সত্য প্রমাণিত হয়নি। আমরা চাই শ্রমবাজার খুলে বৈধভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো হোক।”
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, “মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বাজার সক্রিয় করার পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণের দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বন্ধ থাকা শ্রমবাজারগুলো দ্রুত চালু করা এবং থাইল্যান্ডসহ নতুন বাজারে জনশক্তি রপ্তানির জটিলতা দূর করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আমরা আশা করি দ্রুত ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা দেবে। এর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক পাঠানো সম্ভব হবে।”

