গত বড়দিনে দেশে ফেরার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বল্প সময়ের একটি বক্তব্য দেন। ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ শিরোনামের সেই বক্তৃতা দ্রুতই আলোচনায় আসে। সে সময় কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠী বাদ দিলে সাধারণ মানুষের বড় অংশই একটি নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাবর্তন চেয়েছিল। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে মানুষের এই প্রত্যাশা ছিল স্পষ্ট ও জোরালো।
এই জনমনের প্রবণতা ধরতে পেরেই তারেক রহমান ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বিশ্লেষকদের মতে, জনতার সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজস্ব অবস্থান মিলিয়ে নিতে পারা রাজনৈতিক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সেই বিবেচনায় তাঁর বক্তব্যে পরিপক্বতা ও দূরদর্শিতার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে তাঁর ঘোষিত পরিকল্পনার বিস্তারিত রূপরেখা এখনো স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি, যা নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়ে গেছে।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, একটি কার্যকর ‘নিরাপদ বাংলাদেশ’ গড়তে হলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও সতর্কভাবে পুনর্গঠন করাই হওয়া উচিত মূল অগ্রাধিকার। অপ্রয়োজনীয় ঐতিহাসিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়লে অর্থনৈতিক বাস্তবতা আড়ালে পড়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জনপ্রিয়তা বা ব্যক্তিগত প্রভাব যত বড়ই হোক না কেন, অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হলে তা সামগ্রিক ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে।
বিএনপি যদি শুরুতেই প্রতিহিংসার পথে হাঁটে, তবে তা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপে মামলার সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে, কিন্তু এতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না। বরং ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমে যাবে, বিনিয়োগ থমকে দাঁড়াবে এবং বেকারত্ব বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা। আওয়ামী আমলের শেষ পর্যায়ের ‘দরবেশ যুগ’ যেমন অর্থনীতিকে ভেতর থেকে দুর্বল করেছে, তেমনি অন্তর্বর্তী সরকারের তথাকথিত ‘মব যুগ’ বাইরে থেকে আঘাত হেনেছে। একদিকে নীতিগত দুর্বলতা, অন্যদিকে অস্থিরতা দুই অভিজ্ঞতাই অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে এই দুই পথই পরিহার করা জরুরি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
অর্থনৈতিক কাঠামোতে অলিগার্কদের ভূমিকা নিয়েও সতর্ক অবস্থানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তারা অর্থনীতির সহায়ক শক্তি হতে পারে, তবে নীতিনির্ধারক হিসেবে নয়। উদাহরণ হিসেবে চীনের কথা তুলে ধরা হয়, যেখানে ধনকুবেররা শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও রাষ্ট্রীয় নীতির বাইরে যাওয়ার সুযোগ পান না। জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একই ধরনের নীতিগত দৃঢ়তা দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প চিন্তার কথাও সামনে এসেছে। প্রয়োজন হলে ‘ঘরে বসে কাজ’ বা রিমোট ওয়ার্ক পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সময় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে ঘড়ির কাঁটা স্থায়ীভাবে অন্তত আধা ঘণ্টা এগিয়ে নেওয়া, রাজস্ব বর্ষকে ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা এবং পৃথক রাজস্ব মন্ত্রণালয় গঠনের মতো প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। নগরজট নিরসনে মেট্রোরেলের সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার উদাহরণ হিসেবে ভিয়েতনামের একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়। ২০২৪ সালে ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বিলিয়নিয়ার মাই লানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির রায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের কঠোরতা অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। ফলে বড় ধরনের আর্থিক অপরাধ কমে আসে এবং অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতিও এখানে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০১৪ সালের আগে বিশ্ব অর্থনীতিতে দশম অবস্থানে থাকা দেশটি পরবর্তীতে দ্রুত এগিয়েছে। সেখানে ধনী ব্যবসায়ীরা সম্পদ বাড়ালেও নীতিনির্ধারণে সরাসরি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পান না। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথের মতে, ২০২৮ সালের মধ্যে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। এই অগ্রগতির পেছনে কার্যকর নীতিনির্ধারণ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, বিএনপির জন্যও একই ধরনের নীতিগত স্বচ্ছতা ও দক্ষতা প্রদর্শন করা জরুরি। নীতিনির্ধারণে অযোগ্য বা বিতর্কিত গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত থাকা একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়ার পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
‘শান্তিতে নোবেলজয়ী’ অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে নির্বাচন আয়োজন হলেও তা সর্বদলীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। সমালোচকদের মতে, এতে রাজনৈতিক ঝুঁকি অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে তড়িঘড়ি করে করা একটি মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গোপনীয়তার আড়ালে সম্পাদিত এই চুক্তি দেশের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
বন্দরসংক্রান্ত চুক্তিগুলোতে অধ্যাপক ইউনূসের অতিরিক্ত আগ্রহ নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করেন, এসব উদ্যোগে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একই সময়ে দেশে দারিদ্র্য বাড়লেও অস্ত্রচুক্তির প্রতি আগ্রহকে অনেকেই অস্থির নীতিনির্ধারণের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ সরকারকে এসব পদক্ষেপ থেকে ভিন্ন পথে হাঁটতে হবে।
অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে প্রায় ৮২ বিলিয়ন ডলার বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। এই অর্থে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও, সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষতা, অপচয় ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তবু প্রকল্পগুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
২০২৬ সালের নির্বাচনের পর গঠিত সম্ভাব্য বিএনপি সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ভিন্ন। ১৯৯১ বা ২০০১ সালের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি নয়, বরং নতুন বাস্তবতায় আধুনিক অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতিফলন দেখতে চান নাগরিকরা। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন জীবনে অর্জিত অভিজ্ঞতা বর্তমান নেতৃত্ব কতটা কাজে লাগাতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি ঋণ নিলেও দৃশ্যমান বড় কোনো উন্নয়ন প্রকল্প সামনে আনতে পারেনি—এমন সমালোচনাও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাজেটের বড় অংশই ব্যয় হয়েছে পরিচালন খাতে, উন্নয়ন ব্যয় ছিল তুলনামূলক কম। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা জনতুষ্টিমূলক সিদ্ধান্ত এড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। তবে এই দাবি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
জনগণের ভোগান্তি কমাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ জনতুষ্টিমূলক হলেও তা ইতিবাচক। যেমন—সেতু নির্মাণ যোগাযোগ সহজ করে, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এই প্রেক্ষাপটে পদ্মা ও যমুনা নদীর ওপর নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনাকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সহায়ক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সমালোচকদের আরও দাবি, যদি জনস্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নই লক্ষ্য হতো, তবে গোপন চুক্তির পথে হাঁটা হতো না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য বৃদ্ধিকে তারা জবাবদিহির অভাবের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। কেবল বক্তৃতা দিয়ে নয়, কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমেই আস্থা অর্জন সম্ভব এমন মতও উঠে এসেছে।
ভবিষ্যৎ সরকারের উচিত স্বল্পমেয়াদি সমস্যাগুলো আগে চিহ্নিত করা। এ জন্য অর্থনীতিবিদদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করলে তা ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে সহায়ক হতে পারে। এতে অর্থনীতির গতিপথ আরও সতর্ক ও সুসংগঠিত করা সম্ভব হবে।
২০২৬ সালের নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে জনমনের প্রত্যাশা ভিন্ন মাত্রার। মানুষ চায়, আগের ১৯৯১ বা ২০০১ সালের বিএনপি সরকারের মতো পুনরাবৃত্তি নয়, বরং আধুনিক অর্থনীতি ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের শিক্ষা কাজে রূপান্তরিত হবে। ১৭ বছরের নির্বাসনের অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কতটা দক্ষতা অর্জন করেছেন, তা নতুন সরকারের কার্যক্রমে প্রমাণিত হতে হবে।
ভিন্নধর্মী ও উদ্ভাবনী চিন্তা তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করবে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, এই প্রযুক্তি-যুগে সাপ্তাহিক ছুটি কমানো নয়, বরং প্রয়োজন হলে বাড়ানো যেতে পারে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ‘ঘর থেকে কাজ’ বা রিমোট ওয়ার্ক পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। ঘড়ির সময় স্থায়ীভাবে অন্তত আধা ঘণ্টা এগিয়ে নেওয়া, রাজস্ব বর্ষকে ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সমন্বয় এবং পৃথক রাজস্ব মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাবও গুরুত্বপূর্ণ।
নগরজট নিরসনে মেট্রোরেলের সম্প্রসারণ অপরিহার্য। এছাড়া, উগ্রবাদী মনোভাবকে কোনোভাবেই উৎসাহ দেওয়া যাবে না, কারণ তা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধি দিতে পারে না। নারীদের সব ক্ষেত্রে ন্যায্যভাবে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা, জাতীয় দর্শন স্পষ্ট করা এবং কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থের ভিত্তিতে পররাষ্ট্র সম্পর্কগুলো পুনর্গঠন—এসবই একটি সতর্ক অর্থনীতি গড়ার মূলমন্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।