ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের অর্থনীতিতে নগদ অর্থের প্রবাহে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। নির্বাচনের আগের দুই মাস ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ স্পষ্টভাবে বেড়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসেই নগদ অর্থ বেড়েছে ৭ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। এর আগে নভেম্বরে এই পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি ২ লাখ টাকা।
ব্যাংকারদের মতে, এই বৃদ্ধির পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যয়। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার ও সংগঠনগত খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব ব্যয়ের জন্য ব্যাংক থেকে তুলনামূলক বেশি অর্থ উত্তোলন করা হয়। একই সময়ে সরকারি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডেও ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার জন্য সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেয়। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের শুরু থেকে নগদ অর্থের পরিমাণ ওঠানামার মধ্যেই ছিল। জানুয়ারিতে ২ লাখ ৭৪ হাজার ২৩০ কোটি ৯ লাখ টাকা থেকে ফেব্রুয়ারিতে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি ৬ লাখ টাকায়। মার্চে তা আবার বেড়ে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৩১ কোটি ৬ লাখ টাকায় পৌঁছে। এরপর এপ্রিল ও জুলাইয়ে কিছুটা কমলেও মে ও জুনে আবার বাড়ে। আগস্ট থেকে অক্টোবরে ধারাবাহিকভাবে কমে এসে নভেম্বরে দাঁড়ায় ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি ২ লাখ টাকায়। তবে ডিসেম্বরে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়, যা জানুয়ারিতে আরও জোরালো হয়।
অন্যদিকে, মানুষের হাতে নগদ অর্থ বাড়লেও সামগ্রিক মুদ্রা সরবরাহে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে বলা হয়েছে, গত বছরের ডিসেম্বরে রিজার্ভ মানি বা ছাপানো টাকার পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৩২৪ কোটি ৮ লাখ টাকা। কিন্তু পরের মাস জানুয়ারিতে তা কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৫ কোটি ১ লাখ টাকায়। ফলে এক মাসেই মুদ্রা সরবরাহ কমেছে ১৮ হাজার ৩৬৯ কোটি ৭ লাখ টাকা।
এর আগে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগে মানুষের আস্থা ব্যাপকভাবে কমে যায়। এই পরিস্থিতিতে অনেক গ্রাহক ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে ঘরে রাখার প্রবণতা বাড়ান, যা ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট তৈরি করে। আমানত ধরে রাখতে ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদের প্রস্তাব দিলেও পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে।
তবে একই বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসতে শুরু করে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

