নির্বাচনের পরও দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘ সময় বড় বিনিয়োগ হয়নি। এখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে শুরু হওয়া জ্বালানি সংকটের ফলে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের মতো ফেব্রুয়ারিতেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৬.০৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণ প্রবাহের এই ধীরগতি বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উচ্চ সুদহার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি সংকট উদ্যোক্তাদের নতুন ঋণ নিতে অনীহা তৈরি করছে। ফলশ্রুতিতে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত এখন ধীরগতিতে চলছে। ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়ার পর বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি খাতে মোট ঋণ বিতরণ হয়েছে ১৭ লাখ ৮৫ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। এক বছর আগে এ পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.০৩ শতাংশ। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জানুয়ারি-জুন) বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রেখেছে ৮.৫ শতাংশ।
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই জানিয়েছেন, ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ও অর্থনীতিতে গতি আনতে ব্যাংক খাতের উচ্চ সুদহার কমানো হবে। এছাড়া বন্ধ শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করে অর্থনীতিতে কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হবে। গভর্নরের এই পদক্ষেপ থেকে ধারণা করা যায়, দীর্ঘদিনের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সরতে পারে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “উচ্চ সুদহার বিনিয়োগের বাধা হলেও একমাত্র কারণ নয়। ব্যবসায়ীরা ঋণ নেওয়ার আগে গ্যাস-বিদ্যুৎ, বন্দরসহ অবকাঠামোগত সুবিধা বিবেচনা করেন। বর্তমানে এই অবকাঠামোগত সংকট বড় সমস্যা। অনেক ব্যবসায়ী সম্প্রসারণ করতে পারছেন না, নতুন বিনিয়োগকারীরা এগোতে পারবে না। আগে অবকাঠামোর সমস্যা সমাধান করতে হবে, তারপর সুদহার কমানোর কথা ভাবা যেতে পারে।”
ঋণ প্রবৃদ্ধি কম থাকার আরও একটি কারণ হলো ব্যাংক থেকে সরকারের বাড়তি ঋণ গ্রহণ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত সরকারের নিট ঋণ হয়েছে ৯৮ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯৪.৭৩ শতাংশ। একই সময়ে, ব্যাংক খাত থেকে নেওয়া সরকারের ঋণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে ব্যাংকগুলো রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণের চাপ সামলাচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন দুর্বল হয়েছে, সংরক্ষণ বাড়াতে হয়েছে এবং নতুন ঋণ অনুমোদনে সতর্কতা বাড়িয়েছে। তারল্য সংকট ও আমানত প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা আরও কমিয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদ ১০ শতাংশে উন্নীত করায় বাণিজ্যিক ঋণের সুদহার প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন।
ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে স্পষ্ট। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, শিল্প খাত মন্থর। বিনিয়োগ কমায় অর্থের সঞ্চালন হ্রাস পেয়েছে, কারখানাগুলো সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করছে। ভোক্তা চাহিদা কমেছে এবং বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিও নিম্নমুখী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণ প্রবৃদ্ধি দ্রুত না বাড়লে শিল্প উৎপাদন আরও দুর্বল হবে, বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির থেকে যাবে এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার দীর্ঘ সময়ের জন্য বিলম্বিত হবে।

