মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশের জ্বালানি সংকট এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে অর্থনীতির প্রায় সব খাতে। ইতোমধ্যেই সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ব্যাংক খাতসহ দীর্ঘদিনের টালমাটাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এ সংকটে আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে অন্তত ১০টি খাতে। এগুলো হলো—বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প, কৃষি, আমদানি-রপ্তানি, গৃহস্থালি, সেবা, নির্মাণ, পর্যটন ও বিনোদন এবং টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাত।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থা মূলত আমদানিনির্ভর। মোট জ্বালানির প্রায় ৬৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত মজুদের অভাবে সংকট আরও গভীর হয়েছে। যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালী কার্যত বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বাজারের সময় কমানো, লোডশেডিং বৃদ্ধি, অফিস সময় পরিবর্তন এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ মূলত চাহিদা কমানোর দিকে সীমাবদ্ধ, সরবরাহ বাড়ানোর কার্যকর বিকল্প এখনো অনুপস্থিত।
তাদের মতে, এই যুদ্ধ শুধু নতুন সংকট তৈরি করেনি; বরং আগে থেকেই দুর্বল থাকা অর্থনীতির ভেতরের ভঙ্গুরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, জ্বালানি এমন একটি খাত যার সঙ্গে পুরো অর্থনীতি সরাসরি যুক্ত। বর্তমান সংকট অর্থনীতিকে দ্রুত খারাপ অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ঋণের চাপে রয়েছে। বিদেশি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলার। বাজেট ঘাটতি পূরণেও সরকারকে ধার করতে হচ্ছে, যার ওপর সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে অর্থনীতি আরও সংকটে পড়বে।
এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সরকারকে পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে, জ্বালানি ব্যবহারে কঠোর সাশ্রয়নীতি নিতে হবে এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই তেলের সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে পেট্রোলপাম্পে ভিড় ও জ্বালানি নিয়ে উত্তেজনাও তৈরি হচ্ছে।
তিন ধরনের প্রধান জ্বালানি—তেল, গ্যাস ও কয়লা—বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। কয়লা ও গ্যাসেও বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় সংকট দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। এই সংকট এখন জাতীয় পর্যায়ের সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে জিডিপির প্রধান তিন খাত—কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও জাতীয় বাজেটেও চাপ তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাতসমূহ-
বিদ্যুৎ উৎপাদন: জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমেছে বা আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে। ফলে লোডশেডিং বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে শিল্প ও সেবা খাতে। আবাসিক এলাকায় জেনারেটর ব্যবহারে তেল সংকট আরও বাড়ছে।
পরিবহন খাত: বাস, ট্রাক, লঞ্চ, জাহাজসহ সব ধরনের পরিবহন ডিজেলনির্ভর। জ্বালানি ঘাটতির কারণে ভাড়া বেড়েছে এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। প্রাইভেটকার চলাচলও কমে গেছে, ফলে শ্রমজীবীদের আয়েও প্রভাব পড়ছে।
শিল্প খাত: গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিলসহ সব শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। এতে রপ্তানি আয় কমার পাশাপাশি শ্রমিকদের আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কৃষি: সেচ, ট্রাক্টর, ধান মাড়াইসহ কৃষির প্রতিটি ধাপে জ্বালানি প্রয়োজন। ডিজেল ও বিদ্যুৎ সংকটে কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাণিজ্য খাত: আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, বন্দর পরিচালনা ও কনটেইনার পরিবহন জ্বালানিনির্ভর। সংকটের কারণে এসব কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
গৃহস্থালি খাত: বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে বাসাবাড়ির দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রিজ, ফ্যান, এসি থেকে শুরু করে রান্নার কাজ পর্যন্ত প্রভাবিত হচ্ছে।
সেবা খাত: হাসপাতাল, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিদ্যুৎনির্ভর। লোডশেডিংয়ের কারণে এসব খাতে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নির্মাণ খাত: রড, সিমেন্ট, ইটভাটা ও নির্মাণ যন্ত্রপাতি জ্বালানিনির্ভর হওয়ায় এই খাতেও উৎপাদন কমেছে।
পর্যটন ও বিনোদন: হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো স্বাভাবিকভাবে চলতে পারছে না।
টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি: মোবাইল নেটওয়ার্ক, ডাটা সেন্টার ও টাওয়ারগুলো বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে সেবার মান কমছে। চলমান এই সংকট দীর্ঘ হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি আরও গভীর চাপের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।

